ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

প্যাকেজিংয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং চ্যালেঞ্জ

প্যাকেজিংয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং চ্যালেঞ্জ
×

মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ শতকের মধ্যভাগে আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে পার ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল রাসায়নিক, যা পরিচিত পিফাস নামে– শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের সূচনা ঘটায়। অসাধারণ তাপ-সহনশীলতা, জল ও তেল প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই রাসায়নিক বিশ্বব্যাপী শিল্প উৎপাদনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। খাদ্য প্যাকেট, নন-স্টিকি রান্নার বাসন, জলরোধী কাপড়, তৈরি পোশাক, চামড়া শিল্পসহ অসংখ্য দৈনন্দিন পণ্যে পিফাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

কিন্তু একুশ শতকে এসে সেই ‘অলৌকিক’ রাসায়নিকই আজ মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য নীরব অথচ ভয়াবহ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পিফাস এমন এক শ্রেণির রাসায়নিক, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে সহজে ভাঙে না। মাটি, পানি ও জীবদেহে দীর্ঘ সময় জমে থেকে ধীরে ধীরে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণেই একে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পিফাসের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির সঙ্গে ক্যান্সার, হরমোনজনিত জটিলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও শিশুদের বৃদ্ধিজনিত সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মোড়ক শিল্পে পিফাস ব্যবহারের বিষয়টি বিশ্ববাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। খাবারের মোড়কে ব্যবহৃত এই রাসায়নিক সময়ের সঙ্গে খাবারে মিশে যেতে পারে। গরম ও চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে এই স্থানান্তরের হার আরও বেশি দেখা যায়। ফলে ভোক্তার শরীরে নীরবে প্রবেশ করছে একটি ক্ষতিকর উপাদান, যার প্রভাব তাৎক্ষণিক বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভয়ংকর।

এই বাস্তবতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত অর্থনৈতিক শক্তিগুলো পিফাস নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের পথে হাঁটছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন প্যাকেজিং আইন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ আগস্টের পর খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ে নির্ধারিত মাত্রার বেশি পিফাস থাকলে ইউরোপের বাজারে তা বিক্রি করা যাবে না। আইনটির আরেকটি কঠোর দিক হলো, এখানে পুরোনো পণ্যের জন্য কোনো ছাড় নেই। আইন কার্যকর হওয়ার আগে উৎপাদিত পণ্যও পিফাসমুক্ত না হলে বাজারজাত করা যাবে না। এ আইন পুরো পিফাস শ্রেণির ওপর আরোপিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ উদ্যোগ তাদের পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার বৃহত্তর কর্মপরিকল্পনার অংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের প্যাকেজিং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার লক্ষ্য নির্ধারিত। একই সঙ্গে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ে পুনর্ব্যবহৃত উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। পিফাসমুক্ত প্যাকেজিং এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়; বাজারে টিকে থাকার শর্তে পরিণত।

যুক্তরাষ্ট্রও পানীয় জলে পিফাসের মাত্রা সীমিত করেছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যে ব্যবহৃত পিফাসের বিস্তারিত তথ্য সরকারকে জানাতে বাধ্য করছে। কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ছে। এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের। তৈরি পোশাক, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। তৈরি পোশাক একাই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ জোগান দেয়। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বোতাম, জিপার, রং, জলরোধী আবরণ এবং প্যাকেজিং সামগ্রীতেই পিফাসের উপস্থিতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পিফাসযুক্ত পণ্য ঢুকতে না পারলে এ বছরই বাংলাদেশের অনেক রপ্তানিকারক বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারেন। পিফাসমুক্ত সনদ নিশ্চিত না করতে পারলে পণ্য ফেরত আসার পাশাপাশি ধ্বংস করার মতো পরিস্থিতিও হতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। যার ফলে ইউরোপীয় শুল্ক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এই দুই চাপ একত্রে রপ্তানি খাতের জন্য ‘দ্বিগুণ আঘাত’ হয়ে উঠতে পারে। যা আশঙ্কার, এই বিষয়ে দেশে এখনও পর্যাপ্ত সচেতনতা ও প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পরিবেশ আইন, রপ্তানি নীতি কিংবা শিল্পসংক্রান্ত বিধিমালায় পিফাস বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। আধুনিক পরীক্ষাগারের অভাবে দেশে পিফাস শনাক্তকরণ এখনও সীমিত। পিফাস সংকট শুধু রাসায়নিক ইস্যু নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্ন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রশ্ন, আমরা কি আগেভাগে প্রস্তুত হব, নাকি শেষ মুহূর্তে বাধ্য হয়ে মূল্য দেব?

 ড. মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামাতে ‘রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে কর্মরত। এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত
[email protected]; [email protected]

আরও পড়ুন

×