সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রিজনভ্যানের নিরাপত্তা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতা
প্রিজনভ্যানে পরিবহনকালে আসামিদের নিরাপত্তা পুলিশ বা কারারক্ষীদের ওপর বর্তায়
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৩০
সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আহত হওয়ার খবর জানা গেল মঙ্গলবার। যদিও তিনি প্রিজনভ্যানের মধ্যে পড়ে ঘাড়ে আঘাত পেয়েছেন গত ১৯ এপ্রিল। তাই এমআরআই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় জুনাইদ আহমেদ পলকের হাজিরা ছিল। শুনানি শেষে কারাগারে যাওয়ার পথে নাকি এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে তিনিসহ ভ্যানে থাকা আসামিরা আহত হন অথবা অক্ষত থাকুন; প্রিজনভ্যান দুর্ঘটনা, প্রিজনভ্যান থেকে আসামি পালানো– আসামি ছিনিয়ে নেওয়া, প্রিজনভ্যানে নবজাতকের আদালতে আসা অথবা সবুজ রঙের বিশেষ প্রিজনভ্যানে এসে সেনা হেফাজতে থাকা কর্মকর্তাদের শুনানির জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসার ঘটনায় বারবার পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ‘প্রিজনভ্যান’ প্রসঙ্গে।
প্রিজনভ্যান নিয়ে সাধারণত দুই ধরনের ঘটনা ঘটে। অপরাধী চক্রের সশস্ত্র হামলার ঘটনা এবং নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা। এর বাইরে প্রায়ই আসে মানবিক ঘটনা। সড়কের মাঝখান দিয়ে যখন প্রিজনভ্যান চলে, তখন পথচারী তাকিয়ে থাকেন সেদিকে। যদিও সেই ছাদের কাছের শিক কাটা খোপটুকু ছাড়া আর কোনোকিছু দৃষ্টিগোচর হয় না। তবুও মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল, ভয় আবার মানবিকতাও মিশে থাকে প্রিজনভ্যানের ওই কাঠামোর দিকে তাকিয়ে।
প্রিজনভ্যানে আসামিদের পরিবহনকালে তাদের সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরাসরি ওই ভ্যানে দায়িত্বরত পুলিশ বা কারারক্ষীদের ওপর বর্তায়। ১৮৯৪ সালের প্রিজন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী, বন্দিদের নিরাপদ হেফাজতে রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব। যদি কোনো দুর্ঘটনায় আসামি আহত বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে এর দায়ভার ওই বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হয়। প্রিজনভ্যানে আসামিদের চলাচলের সময় তাদের কাস্টডিয়াল সেফটি নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব।
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রিজনভ্যান দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে ২০২২ সালে। সে বছরের ২ আগস্ট চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী আসামি বহনকারী একটি প্রিজনভ্যান দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে এসআইসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পথে একজন মানসিক রোগীকে বাঁচাতে গিয়ে চট্টগ্রামগামী একটি কাভার্ডভ্যান হঠাৎ ব্রেক দেয়। পেছনে থাকা একটি বাস, তার পেছনে প্রিজনভ্যান এবং তার পেছনে থানার একটি গাড়ি ছিল। হঠাৎ ব্রেক দেওয়ায় সব গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। একই বছরের ১৮ জুন পুলিশের প্রিজনভ্যানে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কা লাগে। ভ্যান উল্টে আহত হন তিনজন। সেদিন কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আসামি নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে যাচ্ছিল ঢাকা জেলা পুলিশের প্রিজনভ্যানটি।
একই বছরের ৬ মে কেরানীগঞ্জের ঢাকা-মাওয়া সড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় ১৭ জন কারাবন্দি এবং দুজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ দুর্ঘটনাটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিম পাশে ঘটেছিল। এ দুর্ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করলাম এ কারণে, প্রিজনভ্যানের ভেতরের যাত্রীদের অবস্থান আর সাধারণ পরিবহনে যাত্রীদের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকে। সাধারণ পরিবহনের যাত্রীরা দুর্ঘটনার সময় কিছুটা হলেও নিজেকে প্রতিরক্ষার সুযোগ পান। দেখতে পারেন, হাত খোলা থাকে এবং নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও কখনও কখনও তাদের থাকে। কিন্তু প্রিজনভ্যানের ভেতরের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সেখানে বন্দিদের খুব আরামে বসানো হয় না। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণ প্রিজনভ্যানগুলোতে প্রায়ই অতিরিক্ত বন্দি পরিবহন করে। ফলে লোহার তৈরি ভ্যানে ছোট জায়গায় গাদাগাদি করেই বসানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা থাকেন হাতকড়া বা শিকল বাঁধা অবস্থায়। আদালত বা অন্য কারাগারে স্থানান্তরের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ অবস্থায় থাকেন আসামিরা।
ভ্যানের ভেতর অনেক বয়স্ক আসামি থাকেন। তারা নিজেরাই ঠিকঠাক নড়তে পারেন না। উপরন্তু যখন দুর্ঘটনা ঘটে, তখন একেবারে নিরুপায় হয়ে যান। ভ্যানের ভেতরের জানালাগুলো খুব ছোট এবং লোহার গ্রিল দিয়ে ঢাকা থাকে, যাতে কেউ পালানোর চেষ্টা করতে না পারে। এতে ভেতরে পর্যাপ্ত আলো বা বাতাসের অভাব তো থাকেই। সে দৃশ্য আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তোলা ক্যামেরার দৃশ্যই বলে দেয়।
কিছুদিন আগে একটি ভিডিও ফুটেজ খুব ভাইরাল হয়েছিল। প্রিজনভ্যানের শিক গলে বেরিয়ে আছে একটি হাত। সেটি তার পিতারই হাত কিনা জানে না শিশুকন্যাটি। স্কুলের পোশাক পরে সে এসেছে আদালত চত্বরে। ভ্যানের ওই অত উঁচু শিক গলে বাইরে থাকা সামান্য আঙুল দেখে তাই অনুসরণ করতে করতে ছুটছে শিশু। ভ্যানটি চলে গেল আবার কারাগারের পথে। কন্যা শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই প্রিজনভ্যানের শেষ চিহ্ন মুছে যাওয়া পর্যন্ত।
এই দৃশ্যের ভেতর কোথায় যেন এক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেল অপরাধ, বিচার, শাস্তি এসব সংজ্ঞা। সম্প্রতি আধুনিক কিছু বিশেষ প্রিজনভ্যানে (ভিআইপি বা উচ্চপদস্থদের জন্য) শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বিগত সরকারের আমলে গুমের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে ঢাকার পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য বাংলাদেশ জেলের বিশেষ সবুজ রঙের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যান ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ভ্যানটি সেই সময় নজর কেড়েছিল গণমাধ্যমের। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসী হামলা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা বা পরিচিতজন পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে বা বাধা দিয়ে আসামিকে নিয়ে যায়– এমন ঘটনাও কম নেই। ২০২৪ সালে উখিয়ায় কুতুপালং আশ্রয়শিবির থেকে হামলা চালিয়ে আসামি কামাল হোসেনকে ছিনিয়ে নিয়েছিল দুষ্কৃতকারীরা।
২০২৫ সালে সিলেটের কুমারপাড়া এলাকায় প্রিজনভ্যান থেকে সুমন নামে এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে যদিও পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল। তবে ২০১৮ সালের ঘটনা ছিল আরও ভয়াবহ। রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে কদম ফোয়ারা এলাকায় বিএনপির মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ও প্রিজনভ্যান ভেঙে আটক দুই কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে দুর্ধর্ষ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে টঙ্গীতে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
প্রিজনভ্যান নিয়ে শুধু আমাদের দেশেই নয়; বিশ্বের অন্যান্য দেশেও নানারকম ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে ফ্র্রান্সে হাইওয়েতে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে এক কুখ্যাত মাদক পাচারকারীকে ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছিল সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। লাতিন আমেরিকায় প্রায়ই প্রিজনভ্যান থেকে আসামি পালানোর চেষ্টার খবর আসে। অপরাধের প্রতীক হয়ে থাকা প্রিজনভ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাও কম নয়। তবে মানবিক দৃশ্যের ঘটনাও বোধকরি বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এর সব ঘটনাতেই উঠে আসে একটি প্রশ্ন প্রিজনভ্যানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি যথেষ্ট? এ নিরাপত্তা মানে যেমন আসামির, তেমনি প্রশাসনেরও। একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শেষ করি প্রিজনভ্যান সমাচার। গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর মায়ের কোলে চেপে ১১ দিনের নবজাতক কারাগারে গিয়েছিল প্রিজনভ্যানে করে। ভ্যানে ওঠার সময় আসামি শাহাজাদীর হাত ধরে রেখেছিলেন একজন নারী পুলিশ। তখন আরেক পুলিশের কোলে ছিল ১১ দিনের শিশুটি। মা ভ্যানে ওঠার পর তাঁর কোলে দেওয়া হয় নবজাতককে। তাদের নিয়ে প্রিজনভ্যান রওনা হয় কারাগারের উদ্দেশে।
বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক রকম আগ্রহের জন্ম দেয় আসামি বহনকারী এই প্রিজনভ্যান। আর এর নিরাপত্তা নিয়ে ভুক্তভোগী আসামি থেকে প্রশাসন উভয়েই।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
