ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

তনু কিংবা কল্পনা

তনু কিংবা কল্পনা
×

মাইকেল চাকমা

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৩৬

বাংলাদেশে ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান কিনা– প্রশ্নটি নতুন নয়। কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো বারবার রাষ্ট্রকে ‘বিব্রত’ করে এবং মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তেমনই দুটি ঘটনা কল্পনা চাকমার অপহরণ ও গুম (১৯৯৬) এবং সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড (২০১৬)।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামে অপহৃত হন কল্পনা চাকমা। তিনি শুধু সাধারণ নারী ছিলেন না; ছিলেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর অপহরণ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার প্রক্রিয়া চলে বছরের পর বছর। তদন্তের ধীরগতি, শুনানির অন্তহীন বিলম্ব আর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। অবশেষে ২৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল রাঙামাটি জেলা আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। এর মধ্য দিয়ে কোনো জবাবদিহি, কোনো বিচার কিংবা সত্য উদ্ঘাটন ছাড়াই একটি গুরুতর অপরাধকে কার্যত ধামাচাপা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নির্মম ও নৃশংসভাবে খুন হন কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। এ ঘটনা মুহূর্তেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের ঢেউ সৃষ্টি করে। তনুর পরিবার মামলা দায়ের করে, ন্যায়বিচারের দাবি তোলে। সেই দাবির আওয়াজ ক্ষীণ হলেও কখনও নিভে যায়নি। দীর্ঘসূত্রতা ও নানা প্রশ্নের মধ্যেও তদন্ত প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। অবশেষে কয়েক দিন আগে একজন সাবেক সেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, যা বিচারপ্রাপ্তি বিষয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বলা যায়, দেরিতে হলেও তনুর জন্য ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাটি অন্তত এখনও জীবিত।

দুটি ঘটনায়ই ভুক্তভোগী নারী। তবুও বিচার প্রক্রিয়ার গতিপথ এত আলাদা কেন? একটি ঘটনায় রাষ্ট্র বিলম্বে হলেও ন্যূনতম সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়; অন্যটিতে বছরের পর বছর দীর্ঘসূত্রতার পর শেষ পর্যন্ত মামলা খারিজ হয়ে যায়। এটি কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কাঠামোগত বৈষম্য রয়েছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বরাবরই একটি সংগ্রামমুখর, সংবেদনশীল অঞ্চল। কল্পনা চাকমার ঘটনা সেখানকার সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ। আইনের জটিলতা, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ এবং দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচারের আশা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, সমতলের একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় অন্তত রাষ্ট্রকে কিছুটা হলেও জবাবদিহির পথে হাঁটতে দেখা যায়। তনুর বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি, কিন্তু প্রক্রিয়াটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তাহলে কি এই দেশে বিচার প্রক্রিয়া ভৌগোলিক ও জাতিগত বিভাজনে আক্রান্ত?

কাগজ-কলমে আইন সবার জন্য সমান– এটি একটি বহুল কথিত মৌলিক নীতি। কিন্তু বাস্তবতা যখন বারবার ভিন্ন ছবি তুলে ধরে, তখন সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। 

কল্পনা চাকমার পরিবারের জন্য প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত। তারা কি কোনোদিন বিচার পাবে? নাকি এ ঘটনা ইতিহাসের আরেকটি চাপা পড়ে যাওয়া অধ্যায় হয়ে থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ক্ষমতা বা বল প্রয়োগে নয়, বরং ন্যায়বিচারের সমতায় নিহিত। যখন সেই সমতা ভেঙে পড়ে, তখন রাষ্ট্র পরিণত হয় নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতায়, যেখানে কিছু মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দুয়ার উন্মুক্ত; অন্যদের জন্য তা চিরতরে রুদ্ধ।

যতদিন কল্পনা চাকমা অপহরণ শুধু একটি অমীমাংসিত ঘটনা হয়ে থাকবে; এটি রাষ্ট্রের ওপর এক গভীর, বেদনাদায়ক ক্ষত হিসেবে বহমান থাকবে। একটি দগদগে স্মারক, যা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের জবাবদিহির সীমাবদ্ধতা, পাহাড় ও সমতলের বৈষম্য সামনে নিয়ে আসবে।

তনু ও কল্পনা: দুই নাম, দুই প্রেক্ষাপট, কিন্তু প্রশ্ন একটাই– এই দেশে ন্যায়বিচার কি সবার জন্য সমান?

মাইকেল চাকমা: রাজনৈতিক কর্মী
 

আরও পড়ুন

×