ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

‘আধুনিক’ কৃষিতে জ্বালানি সংকটের গোড়ার কথা

‘আধুনিক’ কৃষিতে জ্বালানি সংকটের গোড়ার কথা
×

ফরিদা আখতার

ফরিদা আখতার

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৪৬ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৪৮

এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসী হামলার অভিঘাত বাংলাদেশেও এসে লেগেছে; দুইভাবে। আরব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি অনেকেই লাশ হয়ে ফিরছেন। অনেকে ভিসা পেয়েও যেতে পারছেন না। আর দেশের অভ্যন্তরে চলছে ‘জ্বালানি’ সংকট। কৃত্রিম কিংবা প্রকৃত, যা-ই হোক; জ্বালানি সংকট অবশ্যই আছে। আমরা কাতর হয়েছি। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা। শহরের পরিবহনে জ্বালানি সংকটের খবর পত্রপত্রিকায় প্রাধান্য পেলেও কৃষকরা এ সংকটের শিকার হচ্ছেন। অবশ্য তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকের মৃত্যুর কথা প্রকাশিত না হলে এই কথা নিয়ে কেউ হয়তো ভাবত না। 

কৃষকের ওপর জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে নানাভাবে। ডিজেল না পাওয়ায় বোরোসহ বিভিন্ন আবাদি জমির সেচ কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেক সময় খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। ধান, আম, শাকসবজি ও পাট উৎপাদনে এই সময় সেচ দেওয়ার কথা, কিন্তু দেওয়া যাচ্ছে না। ডিজেলের দামও বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। 

বোরো ধানের এই সময়ে কৃষকরা সেচ দেন। কিন্তু ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কাজ ব্যাহত। সময়মতো সেচ দিতে না পারায় অনেক এলাকায় বোরো ধানের ক্ষেত শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। আউশ ধানের বীজতলা থেকে জমি ভাঙা, হাল চাষ, একই সঙ্গে বোরো ধান কাটার জন্য যেসব মেশিন ব্যবহার হয় সব ডিজেলচালিত থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের। আউশ ধানচাষিরা জানিয়েছেন, এ বছর চৈত্র মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। বৈশাখেও বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আউশের জমি চাষের জন্য জমিতে ট্রাক্টর চালাতে পারছেন না মালিকরা ডিজেল সংকটের কারণে।

কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার হয় প্রধানত সেচ কাজে। তবে বিদ্যুৎ চালিত সেচ মেশিনও আছে। তা ছাড়া চাষের জন্য ব্যবহৃত পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর এবং ধান মাড়াই মেশিনেও ডিজেল দরকার। ধান কাটার জন্য কম্বাইন হার্ভেস্টার মেশিন ব্যবহারে ডিজেল লাগে। অনেক কৃষক ধান চাষের জন্য ট্রাক্টর এবং পাওয়ার টিলার ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডিজেল কৃষকরা পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।  

এই সমস্যা কি শুধু ইরানে যুদ্ধের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে? নিশ্চয় না। বরং ইরানের যুদ্ধ জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভরতা কত ভয়ংকর হতে পারে, তারই লক্ষণ স্পষ্ট করে তুলেছে। সেই হাহাকার আমরা ইরান যুদ্ধ না হলেও আগে নানাভাবে দেখেছি।  

একটু পেছনে গেলেই বুঝব সমস্যার গোড়া কোথায়।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তরের দশকে স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকদের ‘আধুনিক কৃষি’ নামে সার-বিষ-সেচনির্ভর চাষাবাদ পদ্ধতি চাপিয়ে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এর একটি সুন্দর গালভরা নামও দেওয়া হয়েছে ‘সবুজ বিপ্লব’। আধুনিক কৃষির শুরুতে মূল বৈশিষ্ট্য ছিল প্যাকেজ পদ্ধতি। বীজের ধরন (উফশী/হাইব্রিড) হতে হবে এবং এর সঙ্গে রাসায়নিক সার, কীটনাশক দিতে হবে এবং গভীর নলকূপ দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সর্বত্র এক রকম না হলেও আধুনিক কৃষিতে সব এক রকম হয়ে গেল। উঁচু-নিচু জমির ধরনের বালাই নেই; সবখানেই সেচ দিতে হবে। 

আধুনিক কৃষি এখানেই থেমে থাকেনি। ক্রমান্বয়ে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ শুরু হলো। চাষের জন্য লাঙল বাদ দিয়ে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ধান কাটা, মাড়াই ইত্যাদি কাজ আর কৃষকের হাতে থাকল না। মেশিনই সব করে দিচ্ছে। যত বেশি যান্ত্রিক তত আধুনিক। তবে মেশিনের মালিক আর কৃষক এক নয়। তাকে টাকা দিয়ে মেশিনের সেবা নিতে হচ্ছে। কিন্তু কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানি (ডিজেল) এবং বিদ্যুৎ-নির্ভর। এখানেই সমস্যার মূল জায়গা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। 

এ পর্যন্ত যত সরকার এসেছে তাদের মধ্যে অন্য কোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলেও কৃষির আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এক সরকারের পর অন্য সরকার এলেও কৃষির আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণে কোনো হেরফের হয়নি। কারণ সরকারের এ ধরনের কৃষি প্রচলন করার পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে এসেছে বহুজাতিক সার, বিষ ও মেশিনারিজ কোম্পানি। এ ধরনের কৃষিতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির সুবিধা তারাই পাচ্ছে।  

ইরান যুদ্ধের কারণে এশিয়ার অন্যান্য দেশেও জ্বালানি পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে এবং তাতে কৃষকরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। এবার শুকনো মৌসুমে এশিয়ায় ধান উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ডেটাবেজ অনুযায়ী ভারত ও চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। তিনটি মৌসুমে ধান চাষ করা হয়– আউশ, আমন ও বোরো। বর্ষার শুরুতে আউশ, বর্ষার শেষ ও শরৎকালে আমন এবং শীতকালে বোরো ধান রোপণ করা হয়। এর মধ্যে বোরো ধান উৎপাদন শুকনো মৌসুমে হয় বলে প্রধানত সেচনির্ভর হতেই হয়। সঙ্গে সার-কীটনাশক তো আছেই। তবুও আধুনিক ও যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থায় বোরো ধানকেই ধানের প্রধান মৌসুম করে ফেলেছে। অথচ আগে আমন ধান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধানের মৌসুম। কিন্তু বর্তমানে বোরো ধান মোট ধান উৎপাদনের ৫৫-৬০% সরবরাহ করে; আর আমন ধানের মাধ্যমে আসে ৩৮-৪০%। আউশ ধান সরবরাহ করে ৬-৮%।

যারা আধুনিক কৃষি করছেন এবং ধানের প্রধান মৌসুম হিসেবে বোরো ধান করছেন তারা জ্বালানি-নির্ভরতার সমস্যা থেকে বের হতে পারছেন না। পুরো কৃষি ব্যবস্থাপনাই জ্বালানি তেল ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। জমি চাষ থেকে শুরু করে সেচ-কাটাই- মাড়াই সবকিছু যান্ত্রিক অর্থাৎ জ্বালানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। বীজের ধরনও পাল্টে গেছে। উফশী কিংবা হাইব্রিড ছাড়া অন্য কোনো বীজ বোরো মৌসুমে ব্যবহার করা হচ্ছে না।  

অথচ বোরো মৌসুম বাংলাদেশে আগেও ধান চাষ ছিল। কিন্তু নিচু ভূমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান উৎপাদিত হতো। হাওর অঞ্চলে নিচু ভূমিতে বোরো ধান হতো; সেটা ছিল দেশীয় জাতের। যেমন টেপা বোরো, বালাম, রাতা ইত্যাদি। এগুলো চাষ করতে গিয়ে কোনো প্রকার সার-বিষ এবং সেচের প্রয়োজন হতো না। বর্তমানে হাওরে উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষে সার, কীটনাশক, সেচসহ সব ধরনের আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বর্ষাকালে হাওর পানিতে ভরে গেলে বোরো ধানে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মাছের ব্যাপক ক্ষতি করে। ধান চাষে পানি লাগবেই। কিন্তু বোরোকে প্রধান মৌসুম করে ফেলায় পানির সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। 

কাজেই কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষির ধরন পরিবর্তন করতে হবে। সার-কীটনাশক-সেচনির্ভর না হয়েও কৃষি করা যায়– সেটা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও প্রমাণিত। আধুনিক কৃষিতে জ্বালানি-নির্ভরতার সমস্যা আরও বাড়বে। তাই দেশের প্রাকৃতিক অবস্থা এবং কৃষকের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিকাজ করতে হবে। শুধু যুদ্ধ নয়; জলবায়ু পরিবর্তনও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আগামীতে আরও বাড়বে। 

তাই গলদটা চিহ্নিত করে কৃষি পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনতে হবে। 

ফরিদা আখতার: নারী ও কৃষি অধিকারকর্মী; অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

আরও পড়ুন

×