পশ্চিমবঙ্গ
বিজেপির বিজয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে
সায়ন্তন ঘোষ
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৭:৫৫
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল বিজয় পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এ অঞ্চলে ১৫ বছর শাসন করেছে। এবারের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিজেপি ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় ২০০টিরও বেশি আসন জিতে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে টিএমসির আধিপত্যের অবসান ঘটল এবং এমন একটি রাজ্যে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হল, যে রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক সীমান্ত রয়েছে—যা ভারত ও তার যেকোনো প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত।
এই রায় বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের নীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো অবৈধ অভিবাসন, গবাদি পশু পাচার এবং উগ্রপন্থী চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। টিএমসি শাসনামলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কেন্দ্রিয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় প্রায়শই বাধার সম্মুখীন হয়েছে এবং অনুপ্রবেশ ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো হালকা করে দেখার অভিযোগও উঠেছে।
এই সীমান্ত রাজ্যে বিজেপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন রাজ্য ও কেন্দ্রিয় নেতৃত্বকে একই আদর্শিক কাঠামোর অধীনে এনেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকারগুলোর নির্বিঘ্ন বাস্তবায়নকে সম্ভব করে তুলেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বাণিজ্য, পানিবন্টন ও নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা এবং অবৈধ অভিবাসন ও বেড়া নির্মাণ সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে উত্তেজনার কারণে ওঠানামা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জনরায় প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয় কৌশলগত সম্পৃক্ততার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি করেছে।
এটি দুর্বলতা মোকাবিলায় ভারতের দর কষাকষির ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। তাছাড়া একই সাথে বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করে। এই রায় একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত পারস্পরিক উন্নয়নে কোনো আপস না করে সীমান্ত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে, যা সংখ্যালঘু সুরক্ষা, অনুপ্রবেশ এবং দ্বিপাক্ষিক অস্বস্তিকর বিষয়গুলোতে ঢাকার হিসাব-নিকাশকে সম্ভবত নতুন রূপ দেবে।
২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়া সাবেক টিএমসি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় হাই কমিশনার হিসেবে ভারতের নিয়োগ একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচায়ক। বাংলার রাজনীতি, আন্তঃসীমান্ত গতিপ্রকৃতি এবং বাঙালি সমাজ সম্পর্কে ত্রিবেদীর গভীর জ্ঞান তাঁকে এই সংবেদনশীল বিষয়গুলো সামলানোর জন্য অনন্যভাবে উপযুক্ত করে তুলেছে।
এই নির্বাচন ঐতিহাসিক বিভেদের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত এই অঞ্চল নিয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে ত্রিবেদী নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির মতো একাধিক ক্ষেত্রে ঢাকার নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন এবং একই সাথে বাংলার নতুন বাস্তবতা তুলে ধরতে পারেন। আস্থা তৈরিতে তাঁর ভূমিকা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিপূরক। ফলে প্রকৃত ভ্রমণকারীদের জন্য ভিসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ছাত্র বিনিময় এবং সংখ্যালঘু কল্যাণমূলক আলোচনার মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে ওঠে।
ত্রিবেদীর এই নিয়োগ বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের অঙ্গীকারের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নিরাপত্তার ব্যাপারে দৃঢ়তার সাথে সহযোগিতার প্রতি আন্তরিকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। এটি ভারতকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিতে প্রভাব ফেলতে এবং উগ্রপন্থী বয়ান মোকাবিলা করতে সক্ষম করে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অভিন্ন স্বার্থকে বাহ্যিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়।
বাংলায় বিজেপির ঐতিহাসিক বিজয় প্রাদেশিক রাজনীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি ভারতকে একটি সুসংহত, দৃঢ় অথচ গঠনমূলক বাংলাদেশ নীতি অনুসরণের জন্য প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক হাতিয়ারে সজ্জিত করেছে। সীমান্ত সুরক্ষিত করে, হুমকি মোকাবিলা করে এবং সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে এই জনরায় একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ পূর্ব সীমান্তের প্রতিশ্রুতি দেয়—যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। আর একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাবে। আগামী বছরগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গির পরীক্ষা নেবে, কিন্তু ২০২৬ সালে স্থাপিত ভিত্তি এক যুগান্তকারী সুযোগ এনে দিয়েছে।
সায়ন্তন ঘোষ: অধ্যাপক এবং ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড বেঙ্গল’ ও ‘দ্য আম আদমি পার্টি’ বইয়ের লেখক; ফার্স্টপোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- পশ্চিমবঙ্গ
- বিজেপি
