অন্যদৃষ্টি
ছিনতাইকারীর মুখোমুখি বুলেট বৈরাগী
অশেষ কান্তি দে
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সময় পাল্টেচ্ছে। পাল্টেছে ছিনতাইয়ের ধরনও। জীবন এমনিতেই অনিশ্চিত। এই পোড়া দেশে তো তা আরও বেশি অনিশ্চয়তার।
কে কখন নির্মম ঘাতক হয়ে উঠে সে বোঝা বড় ভার। শুধু জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, তারা হয়ে উঠেছে প্রাণনাশের কারণ।
বুলেট বৈরাগী এক সুদর্শন কাস্টমস কর্মকর্তা। তার চাইতে বড় কথা, তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। দারিদ্র্যের কশাঘাতে তাঁর বড় হওয়া। সেই ছেলেকে পড়ানোর জন্য তাঁর মা-বাবাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে দিয়েছিলেন তারা। সোনার ছেলে বড় হবে একদিন। ছেলে তাদের আস্থার প্রতিদান দেওয়া শুরু করেছিলেন বটে। মেধার সঙ্গে একের পর এক জীবনের সিঁড়ি অতিক্রম করেছিলেন সার্থকভাবেই।
কাস্টমস কর্মকর্তা হওয়ার আগে বুলেট অন্যান্য সরকারি চাকরি করেছেন। ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তাও। শেষমেশ ৪১তম বিসিএস থেকে হয়ে গেলেন কাস্টমস কর্মকর্তা। কুমিল্লায় পোস্টিং। প্রিয় মা-বাবাকে জানালেন তাঁর সঙ্গে তারাও যাবেন সেখানে। উদ্দেশ্য–সারাজীবন সংসারের ঘানি টানা মা-বাবাকে ভালো রাখা। সঙ্গে প্রাণপ্রিয় স্ত্রী, পরে আসা তাদের আদুরে সন্তান।
হ্যাঁ, সবকিছুই এগোচ্ছিল ঠিকঠাক। দুঃখ থেকে মিলে ছিল সুখের দেখা।
আগেকার গল্প দূরে ঠেলে বুলেট বৈরাগীর পরিবার তখন সুখী আদর্শ একটি পরিবার। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে হাসিখুশিতে পার করা এক-একটা দিন।
অতীতের সীমাহীন কষ্ট পেছনে ফেলে কেবল নতুন দিনের সূচনা তখন। গুছিয়ে নেওয়া সংসারে যে কালবৈশাখী আসবে, কে জানত!
বুনিয়াদি ট্রেনিংয়ের জন্য বুলেট বৈরাগীকে যেতে হলো চট্টগ্রাম। আদরের ছেলের প্রথম জন্মদিন উদযাপন করবেন বলে ঝুঁকি নিয়ে বেশ রাত করে ফিরলেন কুমিল্লায়।
বাস থেকে যখন নামলেন, সিএনজি অটোরিকশায় ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা তাঁকে টার্গেট করল। আর একজন হলে ছেড়ে দেবে–এ কথায় তিনিও উঠে পড়লেন।
একটু সামনে যাওয়ার পর ছিনতাইকারীরা তাঁকে উপর্যুপরি আঘাত করে তাঁর কাছে থাকা সবকিছু হস্তগত করে নেয়। তারপর চলন্ত গাড়ি থেকে তাঁকে ফেলে দেয়। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে বুলেট বৈরাগীর। অবশেষে মৃত্যু!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ছিনতাইকারীর নেপথ্যে আছে এক সংঘবদ্ধ চক্র।
আবিষ্কার হবে কি তার মূলে আছে আর কারা কারা? হবে কি তাদের মূলোৎপাটন!
পরিবারকে বুলেট জানিয়েছিলেন আসতে দেরি হবে তাঁর। স্ত্রীকে বলেছিলেন ঘুমিয়ে পড়তে। তখন তিনি কী আর ঘুণাক্ষরেও জানতেন, প্রিয়তমা স্ত্রীকে ঘুমানোর কথা বলে তিনি নিজেই ঘুমিয়ে পড়বেন অনাদিকাল।
বাসায় ফিরতে অনেক দেরি হচ্ছে বলে পরিবার থেকে বারবার ফোন দেওয়া হয় বুলেটকে। অতঃপর ফোন রিসিভ হলে যে কণ্ঠ শোনা যায় তাতে পরিবার বুঝে ফেলে সে কণ্ঠ বুলেটের নয়।
অবশেষে তারা বেরিয়ে পড়েন সন্ধানে। একটি বন্ধ হোটেলের সামনের ফুটপাতে পাওয়া যায় তাঁর নিথর দেহ।
যেখানে এখন শুধুই বিলাপ। যেখানে এখন আছে অকালে স্বামী হারানোর ছটফটানি হাহাকার আর অস্থির দীর্ঘশ্বাস। অবুঝ ছেলে যে কিনা বুঝতেই পারছে না সে তার বাবাকে হারিয়েছে, হয়েছে পিতৃহারা। সারাজীবনের জন্য পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত। বুলেট বৈরাগী তাঁর একটি স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন–আমার ছেলে সামান্য কাশি দিলেও আমার বুক কেঁপে ওঠে! আহারে পিতৃহৃদয়!
সন্তান হারানো পিতা, স্বামী হারানো স্ত্রী কিংবা পিতা হারানো সন্তান এসব দেখতে-শুনতে অভ্যস্ত এই সমাজ। বুলেট বৈরাগীর নির্মম মৃত্যু যেন সেই বিপন্ন সমাজের আরেক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
অশেষ কান্তি দে: প্রভাষক, জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
