ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ডিসি সম্মেলন

মব বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর হউক

মব বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর হউক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সদ্য সমাপ্ত জেলা প্রশাসক তথা ডিসি সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং মব নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের যেই নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে, উহাকে আমরা স্বাগত জানাই। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের সময়ে প্রথমবারের এই ডিসি সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করা, প্রশাসনকে আরও কার্যকর, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করিবার নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। বিশেষত কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের ঘটনায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হইয়াছে। 

মব সহিংসতার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটিয়াছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। দুঃখজনক হইলেও সত্য, এহেন সহিংসতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার শূন্যসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের ঘোষণা দিলেও উহা বন্ধ হইতেছে না। মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-এমএসএফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সমগ্র দেশে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ২১ জন প্রাণ হারাইয়াছেন। সংখ্যাটা মার্চে ছিল ১৯ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৮। প্রসঙ্গত, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বৎসর গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন ১৯৭ জন। বলা যায়, এই আদিম বর্বরতার শিকার হইয়া মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবার সংখ্যা এখনও কম নহে। অথচ যে সকল কারণে জনগণ দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় কামনা করিয়াছিল সেগুলির মধ্যে মব সহিংসতা ছিল অন্যতম। বর্তমান সরকারপ্রধানও নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে একাধিকবার সকল প্রকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণপূর্বক দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। সেই দিক হইতে ডিসি সম্মেলনে মব সহিংসতা দমনে সরকারের নির্দেশনা তাৎপর্যপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। 

তবে ইহাও উল্লেখ কবিবার প্রয়োজন রহিয়াছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহল যেভাবে মব সহিংসতাকে কখনও জনরোষের প্রকাশ, কখনও প্রেশার গ্রুপের তৎপরতা হিসাবে বর্ণনা করিয়া উহাকে উৎসাহ প্রদান করা হইত, সেই রকম কিছু, দুর্ভাগ্যবশত, এ সরকারের মধ্যেও দেখা যাইতেছে। কুষ্টিয়ায় মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে এক পীরকে হত্যা করিয়া তাহার দরবার জ্বালাইয়া–পোড়াইয়া দেওয়ার নৃশংস ঘটনাকে মব সন্ত্রাস নহে বলিয়া প্রদত্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ৪ মে এহেন সহিংসতাকে আরেকজন মন্ত্রীর ‘জনগণের প্রতিক্রিয়া’ হিসাবে বর্ণনা করিবার এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। আমরা দেখিয়াছি, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ, মাদকের বিস্তার, সাইবার অপরাধ এবং সহিংস ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা ও দ্রুত পদক্ষেপের অভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করিয়া তুলিয়াছে। তাই অপরাধ দমন, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারের তরফ হইতেও তদারকি অব্যাহত রাখিতে হইবে। 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। ইহা অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সহিতও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মব সহিংসতার বিস্তার যেই কোনো জনপদে আতঙ্ক বাড়াইতে পারে। কোনো এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়িলে তথাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। সেই জন্যই ইহাকে সাময়িক প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসাবে না দেখিয়া দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসাবে বিবেচনা করিতে হইবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাহার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হইলে জনগণের আস্থা ফিরিবে না। ইহার সহিত জনগণবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও প্রয়োজন, যাহাতে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রশাসনের সহায়তা পাইতে পারে। 

আরও পড়ুন

×