ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবি কতটা বাস্তব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ক্রিস্টিয়ান এমেরি
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ১৪:১৪ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ১৪:৪০
ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাস পর এই সংঘাত শুরু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি কারণ সামনে এনেছিল। একইসাথে সাফল্য দাবি করার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনের ন্যূনতম কিছু মানদণ্ড ছিল। বর্তমানে এসব কারণ ও মানদণ্ড দুটোই দুর্বোধ্য বলে মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, মার্কিন কর্মকর্তারা এখন যুক্তি দিচ্ছেন যে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রায় এক মাস আগেই যুদ্ধটি মূলত মার্কিন অনুকূলে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে চালানো বিপর্যয়কর যুদ্ধের এর চেয়ে মারাত্মক অভিযোগ আর হতে পারে না, যখন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৫ মে সাংবাদিকদের বলেন যে, এখন মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীকে ‘আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা’। তার মতে, ‘যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারবে, পানিতে কোনো মাইন থাকবে না, কেউ টোল দেবে না’।
তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথক প্রতিরক্ষামূলক ও মানবিক অভিযান। আর মার্কিন জাহাজগুলো আক্রমণের শিকার হলেই কেবল তা যুদ্ধে পরিণত হবে, যা প্রকৃতপক্ষে একই দিনে ঘটেছিল। রুবিও এই সুস্পষ্ট স্ববিরোধিতা উপেক্ষা করেছিলেন যে, যে যুদ্ধটিকে তিনি একই সাথে ইতোমধ্যে জয় করা যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন, ঠিক সেই যুদ্ধের কারণেই মানবিক অভিযানটি অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
সেদিন পরে পরিস্থিতি আরও উদ্ভট মোড় নেয়। ট্রাম্প মাত্র একদিন পরেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করার ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন নৌবাহিনীকে প্রণালী থেকে ট্যাঙ্কারগুলোকে সুরক্ষিত রেখে বের করে দেওয়ার কথা ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির পথে ‘ব্যাপক অগ্রগতির’ কথা উল্লেখ করেন। এর আগেও বেশ কয়েকবার যা ঘটেছে, এবারও বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠার পর আবার অবনতি ঘটে।
যদিও খুব কম লোকই সন্দেহ করে যে, ট্রাম্প এই বিপর্যয়কর যুদ্ধ বন্ধ করতে মরিয়া, বিশেষ করে ১৪ মে বেইজিং যাওয়ার আগে, তিনি একটি যুগান্তকারী সাফল্যের ধারণাটিকে ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জিত করেছিলেন। ইরানীরা কেবল যুদ্ধের একটি টেকসই অবসানের লক্ষ্যে ৩০ দিনের আলোচনার জন্য ১৪-দফার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছিল।
ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম পরিত্যাগ করার আরও জোরালো কারণ হল, এটা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল যে এটি সংকটের সমাধান করবে না। বর্তমানে প্রণালীর পেছনে আটকে থাকা ১ হাজার ৫০০টি জাহাজের বেশিরভাগ মালিকই নৌবাহিনীর সুরক্ষা পেলেও যাতায়াতের ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। এর জবাবে ইরান জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা খোদ যুদ্ধবিরতিকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
ওয়াশিংটনের সমস্যা হল, ইরানীরা সম্ভবত এই দাবি জানাবে যে, যদি ট্রাম্প ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিতে রাজি হন, তবেই আলোচনা শুরু হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যেতে পারে। মার্কিন এই অবরোধ ইরানের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক ক্ষতি করছে।
অন্য সবকিছুর বাইরে, ইরানি কর্মকর্তারা অবরোধ তুলে নেওয়াকে একটি যৌক্তিক পারস্পরিক সম্মতি হিসেবে দেখছেন। কিন্তু তারা এও বোঝেন যে, প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থায়ী কাঠামোগত ক্ষতি হওয়ার আগেই সময় ফুরিয়ে আসছে, যদি তা ইতোমধ্যে না হয়ে থাকে। এই বিষয়টি এই মুহূর্তে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবুও আলোচনা শুরু হলেও, যুদ্ধের আগে যে সমস্যাটি চুক্তি হতে বাধা দিয়েছিল, সেটি বহাল রয়েছে। ট্রাম্পের কাছে তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামার মতো বিস্তারিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতি কাঠামো নেই, ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তিকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট মরিয়া হয়ে ছাড়িয়ে যেতে চান। ওবামার চুক্তিটি সম্পন্ন করতে ২০ মাসের তীব্র বাদানুবাদের প্রয়োজন হয়েছিল। একই সাফল্য অর্জনের জন্য ট্রাম্পের ধৈর্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা সরাসরি কূটনৈতিক সংযোগ—কোনোটাই নেই।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধটির কারণেই সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি। ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাপ্রদান এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতায়ন আরও জোরালো করার কারণে এই সমীকরণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আর ইরান এখন উপলব্ধি করেছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে তার হাতে কতটা বাড়তি সুবিধা রয়েছে।
ক্রিশ্চিয়ান এমেরি: ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- ইরান যুদ্ধ
