সমকালীন প্রসঙ্গ
কার জন্য কান পেতে রই?
ছবি-সংগৃহীত
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ১৮:১৬
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে বারে বারে/ কান পেতে রই’ গানটি লিখেছিলেন ১৯২২ সালে। বাউল-অঙ্গের ধারায় এবং পূজা পর্যায়ভুক্ত এই গানে মানুষের অন্তরের সেই অবস্থাটিই প্রকাশিত, যে অবস্থায় মানুষ গভীর মনোযোগে ‘চিরসত্তা’র ধ্যানে নিমগ্ন থাকে। কিন্তু বিশ্বায়নের জটিল যুগে নিজেকে প্রশান্তির ধারায় নিমগ্ন রাখার সুযোগ কি রেখেছে অসহিষ্ণু এই বিশ্ব!?
অন্তর্যামীর কাছে আপনি আমি কান পেতে রইলেই কি আমাদের জাহাজ নির্বিঘ্নে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে? তাঁর উদ্দেশে কান পাতলেই কি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে তেল কেনার অনুমতি আরও ক’দিন বাড়িয়ে দেবে বাংলাদেশকে! তাঁর কাছে আমাদের নিমগ্ন থাকার সুবাদেই কি গাজায় শিশুদের আর্তনাদ থেমে যাবে! শূন্য থালাবাটি হাতে গাজার বুভুক্ষু মানুষগুলো কি দুমুঠো খেতে পাবে! আমাদের প্রত্যাশার কারণেই কি ইরানে মার্কিন আগ্রাসন থেমে যাবে; লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হবে! ইউক্রেনে যুদ্ধ থামিয়ে দেবে রাশিয়া!
গাজা, ইউক্রেন, আমেরিকার মতো অত দূর দেশের কথায় নাই-বা গেলাম; নিজ দেশের কথাতেই আসি। ভালো কথা, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ‘দূরের কথা’ বলিই-বা কী করে! জ্বালানি সংকট দেখে কি মনে হয়, আমরা বিশ্ব-পরিস্থিতির বাইরে? সরকার তো তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হলো এই সংকটে পড়েই! বাজারে হু-হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম! সেটাও তো ওই বিশ্ব-পরিস্থিতিরই ফসল; নাকি অন্য কোনো সিন্ডিকেশনের খেলা? তাহলে আমরা আর বিশ্বসংকটের বাইরে রইলাম কোথায়!
আজকের এই যুগে কোনো রাষ্ট্র, বিশেষত আমাদের মতো দেশগুলোর কি আদৌ কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা নিরাপত্তা বলতে কিছু আছে! যদি থেকেই থাকে তাহলে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট তাঁর নিজ দেশে নিজ ভবনের শোবার ঘর থেকে ছিনতাই হন কীভাবে! আগে শুনতাম ছিনতাইয়ের মতো কুকর্মগুলো আমাদের গুলিস্তান, সদরঘাট কিংবা গাবতলী এলাকায় কদাচিৎ হয়ে যেত। কিন্তু এখন দেখি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আর উদার গণতন্ত্রের দেশও এসব কর্মে লিপ্ত!
যুক্তরাষ্ট্রের কথা এলোই যখন, আমাদের সঙ্গে সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তিটির কথা বলেই ফেলি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র তিন দিন আগে অসম বাণিজ্য চুক্তিটি করেছে, যার ফলে আগামী অন্তত ১৫ বছর অর্থ এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাধা। কথাটি আমার নয়, বিশেষজ্ঞদের।
এই তো ক’দিন আগে একটি সেমিনারে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বললেন, ‘এই চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। এ রকম একটা ভয়ংকর অবস্থায় যেতে না চাইলে সমাজের সব পর্যায় থেকে এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আসতে হবে।’
এই ভয়ংকর চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আর কী কী ‘সর্বনাশ’ করেছে, সেটির বিষয়ে তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা ও অপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সর্বনাশা কাজ করেছে। তাদের অনেকে হয়তো এখন বিদেশে থাকেন। যেখানেই থাকুক, তাদের বিচার করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।’
দেশের স্বার্থের সঙ্গে এত বড় গাদ্দারি কী করে হতে পারে, উল্লিখিত সেমিনারে সেই প্রশ্ন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেন, ‘এই চুক্তি পড়ে কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে এই দাসখতে ঢুকিয়ে গেছে।’
বর্তমান সংসদের একজন সদস্যও এ বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংসদে কথা না বলায় ওই সেমিনারে আক্ষেপ করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বাস্তবে যারা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারত, সেই তরুণ ছাত্রসমাজের অনেকেই এখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত– নানাভাবে, নানা কারণে। কেউ কেউ বিশ্রামে আছেন। বাকিদের মধ্যে যারা কিছুদিন আগেও লড়াই-সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলনে; তাদের অনেকেই এখন পৌঁছে গেছেন ‘মঞ্জিলে মকসুদে’। তাদেরই একজন সেদিন ‘সংসদ সদস্যদের’ গাড়ি লাভের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন সংসদে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে প্রতিবাদ করার ইচ্ছা কিংবা অবকাশ কোথায় তাদের! গাড়িই এখন তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য! উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে সুদমুক্ত কিংবা অন্য যে কোনো ধরনের গাড়ি না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিষয়টি ধন্যবাদার্হ।
শুনেছিলাম, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনে প্রধানমন্ত্রীর এক পিয়নও নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়ে গিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো দেখি মাত্র তিন মাসের মাথায় একজন উপদেষ্টার এপিএস আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।
ফিরে আসি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের কথায়। সেমিনারে তিনি উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম দেখতে চাইলে বা অন্য যে কোনো দেশের আধিপত্যের বাইরে রাখতে হলে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে– আমরা ওয়াশিংটন, দিল্লি, ইসলামাবাদ, বেইজিং, মস্কো– কোনো আধিপত্যই মানব না, বাংলাদেশ বাংলাদেশের জায়গায় থাকবে। বাংলাদেশকে নিজের মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে হবে।’
সুধী পাঠক, এত কিছুর পরেও আশায় বুক বাঁধি; স্বপ্প দেখি এক শক্ত-মেরুদণ্ডী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। ‘কান পেতে রই’ সেই আশায়, আবার যদি কোনোদিন শুনতে পাই আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা। সৈয়দ শামসুল হক যেমন তাঁর ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে লিখেছিলেন– ‘দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, মানুষ নির্ভয় হাতে আঙিনায় ঘর তুলিতেছে। দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, হামার পুত্রের হাতে ভবিষ্যৎ আছে। দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, হামার কন্যার চোখে সুস্বপন আছে। দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, হামার ভাইয়ের মুখে ভাই ডাক আছে। দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, হামার ভগ্নীর ঘর নিরাপদ আছে। দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ, সুখে দুঃখে অন্নপানে সকলেই একসাথে আছে। সোনার বাংলার সোনা বাংলাদেশে আছে। সোনার বাংলার সোনা বাংলাদেশে আছে। সোনার বাংলার সোনা বাংলাদেশে আছে।’
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা
- বিষয় :
- মতামত
