সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বারবার হোঁচট কেন
ফাইল ছবি
মাহামুদুল হক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ২০:০৯
সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি গভীর উদ্বেগজনক চিত্র হাজির করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) তাদের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২৬ প্রতিবেদনে। ইতিহাসে এই প্রথম, বিশ্বের ১৮০টি দেশের অর্ধেকেরও বেশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে পাঁচটি শ্রেণির মধ্যে সর্বশেষ দুটি–‘কঠিন’ ও ‘অত্যন্ত গুরুতর’–শ্রেণিতে অবস্থান করছে। ‘অত্যন্ত গুরুতর’ শ্রেণিভুক্ত দেশগুলোর স্কোর শূন্য থেকে ৪০-এর মধ্যে, আর ‘কঠিন’ শ্রেণিতে থাকা দেশগুলোর স্কোর ৪০ থেকে ৫৫-এর মধ্যে নির্ধারিত। গত ২৫ বছরের ইতিহাসে এতটা নিম্নমুখী বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার গড় সূচক আর কখনও দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, সামাজিক ও নিরাপত্তা–এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে আরএসএফ। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছরে সবচেয়ে বেশি অবনতি ঘটেছে আইনগত সূচকে। এর কারণ হিসেবে প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতাকে ক্রমশ ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সত্য যখন স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন সরকার বা প্রভাবশালী মহলের দৃষ্টিতে সাংবাদিকতা ‘অপরাধে’ পরিণত হয়। এ কারণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারা, যেমন–মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী আইন–ব্যবহার করে মামলা করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই: সমালোচনামুখর সংবাদমাধ্যমকে স্তব্ধ করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম অবস্থানে নেমে এসেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ শ্রেণিতে অবস্থান করছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে গভীর সংকটের প্রতিফলন, তা আরএসএফের প্রতিবেদনে বারবারই সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। কেন এমনটি ঘটছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
এ প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বছরে সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত তো হয়ইনি, বরং আরও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক হামলা পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গিন করে তোলে। ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ রাতে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিনকে প্রকাশ্যে হত্যা, ঠুনকো কারণে সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতি ও মামলার মতো ঘটনা সংবাদমাধ্যমকে এক ভীতিকর বাস্তবতায় ঠেলে দেয়। স্বাধীন মতপ্রকাশ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায় নিজের জীবন রক্ষা করা।
একথা স্পষ্ট, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট কেবল কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে। এ দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক বরাবরই এমন টানাপোড়েনপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর থেকে পূর্ববর্তী প্রায় প্রতিটি সরকারই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সংবাদ পরিবেশনা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে এক ধরনের সমঝোতার ফল, যেখানে সত্য প্রকাশের চেয়ে ক্ষমতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতাকে ‘নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা’ বলা যায়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উত্তরসূরি হিসেবে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতার জন্য ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার, তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গের আশঙ্কা এবং ডিজিটাল নজরদারি–এসব উপাদানের কারণে সৃষ্ট অদৃশ্য সেল্ফ সেন্সরশিপ সংবাদকর্মীদের মধ্যে ক্রমেই স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হচ্ছে।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। সাংবাদিকরা এখন শুধু রাষ্ট্রীয় চাপ নয়; বরং রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রবাদী হুমকি এবং অনলাইন হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।
মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি তত্ত্ব এবং ইউনেস্কোর তৈরি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সূচক (২০১৫) প্রয়োগ করে সম্প্রতি ৫১৮ জন সাংবাদিকের ওপর (যার মধ্যে ১৭.৫ শতাংশ ঢাকাভিত্তিক এবং ৭৬.৭ শতাংশ রাজধানীর বাইরের) আমি একটি গবেষণা পরিচালনা করি। এর ফল ছিল গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৭.৫ শতাংশ সাংবাদিক তাদের পেশাগত কাজের কারণে অন্তত একবার শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন এবং ৬৫.৬ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন। এ ছাড়া ৩৬.৭ শতাংশ সাংবাদিক পুলিশি হয়রানি বা ভীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক–৮৭.৯ শতাংশ–নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বর্তমানে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন।
দেশে ইন্টারনেটের বিস্তার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসার তথ্যপ্রবাহের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ডিজিটাল পরিসরই নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফলে তথ্যের প্রবেশাধিকার বাড়লেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে–একটি আধুনিক ‘ডিজিটাল প্যারাডক্স’।
সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্ট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক চাপের সম্মিলিত ফল। এই পরিস্থিতির অবসানে প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যেখানে সংবাদমাধ্যমকে জনস্বার্থের রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্যথায় র্যাং কিংয়ের এই নিম্নগতি কেবল অব্যাহতই থাকবে না, বরং গণতান্ত্রিক পরিসরকেও আরও ছোট করবে।
মাহামুদুল হক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
- বিষয় :
- গণমাধ্যম
- সংবাদমাধ্যম
- উদ্বেগ
- নিরাপত্তাহীনতা
- সাংবাদিক
