ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়
তেহরান প্রচলিত সামরিক বিজয় অর্জনের পথে না গিয়ে ভিন্নধর্মী কৌশল গ্রহণ করে
খন্দকার মো. মাহফুজুল হক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ২২:২৯
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা সংঘাত শুধু একটি সামরিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের সামরিক ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বহু বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানকে আর দুর্বল, বিচ্ছিন্ন কিংবা সহজে দমনযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের মতো স্বীকৃত পরাশক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে টিকে থাকা, পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার হিসাব পাল্টে দেওয়ার মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা, তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকারিতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে অনেক মার্কিন ও ইসরায়েলি সমরবিদের ধারণা ছিল, উন্নত প্রযুক্তি, আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমন্বিত চাপ প্রয়োগ করে খুব দ্রুতই ইরানকে দুর্বল ও কার্যত অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই হিসাবকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে।
ইরান শুধু প্রতিরোধ গড়ে তুলেই থেমে থাকেনি; বরং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং পরিকল্পিত যুদ্ধকৌশলের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে। এতে যে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে তা হলো প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রাজনৈতিক বা কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করে না।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তাদের 'টিকে থাকার সক্ষমতা'। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তির সরাসরি সামরিক চাপ, অবরোধ এবং বহুমাত্রিক আক্রমণের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা, সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা ইরানের রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও কৌশলগত সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের প্রধান নিরাপত্তা গ্যারান্টার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোতে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে 'নিরাপত্তা ছাতা' হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।আরব দেশগুলোর জনগণ এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠছে যদি মার্কিন ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো না যায়, তাহলে তাদের এই সামরিক উপস্থিতির প্রকৃত উপকারিতা কী?
অনেক আরব ভাষ্যকার বলছেন, মার্কিন ঘাঁটি নিরাপত্তার চেয়ে বরং আরব দেশগুলোকে আঞ্চলিক ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সংঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। কারণ যেকোনো সংঘাতে প্রথম আঘাত আসছে এসব ঘাঁটির দিকেই। এরই প্রেক্ষিতে পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রতি দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-ভরসাকে দৃশ্যমানভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।
সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, আমেরিকা নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলেও যুদ্ধের সরাসরি মূল্য দিতে হয় আরব দেশগুলোকে। ফলে এখন অনেক আরব রাষ্ট্র বিকল্প নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ভাবছে। তারা চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গেও সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই সংঘাতে যুক্ত হতে ইউরোপীয় দেশগুলো অনীহা প্রকাশ করেছে, শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ইউরোপীয় রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ হলো:
প্রথমত, ইউরোপ এখনো ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বহন করছে। এমন অবস্থায় নতুন আরেকটি বড় সংঘাতে জড়ানোকে তারা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপের অনেক দেশ আশঙ্কা করেছিল যে ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করবে এবং এতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করবে। তৃতীয়ত, ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি অংশ মনে করে যে ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের কিছু গোয়েন্দা মূল্যায়ন অতিরঞ্জিত ছিল এবং যুদ্ধের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন অনিশ্চিত। ফলে ইউরোপ সামরিক অংশগ্রহণের বদলে কূটনৈতিক সমাধান ও উত্তেজনা প্রশমনে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এই সংঘাত শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। দেশটির অনেক নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়ানোর প্রয়োজন কেন দেখা দিল? কেউ কেউ সরাসরি এটিও বলেছেন, “এটি আমেরিকার যুদ্ধ নয়, বরং ইসরায়েলের যুদ্ধ।” বিশেষ করে তরুণ ভোটার, প্রগতিশীল গোষ্ঠী এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করেছে। অনেকের মতে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর আমেরিকান জনগণ আর দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সংঘাতে আগ্রহী নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং সামরিক উত্তেজনা যু্ক্তরাষ্ট্রের আগামী মধ্যবর্তি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটির ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক নেতা অভিযোগ করেছেন যে, কংগ্রেসে যথেষ্ট পর্যালোচনা ছাড়াই এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি দেখা গেছে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরােয়লের উচ্চাভিলাষী আঞ্চলিক নীতি এবং ইরানকে ঘিরে ক্রমাগত হুমকির বয়ান ওয়াশিংটনকে যুদ্ধমুখী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে মার্কিন রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এখন মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও কৌশলগত লক্ষ্যই অধিক প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলে মার্কিন জনমতের একটি অংশে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে 'ইসরায়েলের যুদ্ধ, আমেরিকার নয়'- এ ধরনের স্লোগান দেখা গেছে। একই সঙ্গে সাবেক কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে ইরান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল। এখন বিশ্বজুড়েই স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যাচ্ছে যে, এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বেড়ে গেছে তেলের দাম, বৃদ্ধি পেয়েছে শিপিং ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি তুলনা চলে না, এটাই বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই হয়তো তেহরান প্রচলিত সামরিক বিজয় অর্জনের পথে না গিয়ে ভিন্নধর্মী কৌশল গ্রহণ করে। তাদের কৌশলের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠে যুদ্ধের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত ব্যয় এতটাই বাড়িয়ে তোলা, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ক্রমশ কঠিন, ব্যয়বহুল এবং অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে ইরান সেই চাপ তৈরিতে অনেকাংশেই সফল হয়েছে।
সার্বিক বিবেচনায় রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থে ইরান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে: তারা তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে, পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে, মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণ করেছে, আরব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা ভাবমূর্তিকে দুর্বল করেছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, “আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব” দীর্ঘদিনের প্রচলিত এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। পাশাপাশি এই যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে। এখন আর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগের মতো প্রশ্নাতীত নয়, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন, আর আরব দেশগুলোও একক নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে সরে বহুমুখী কৌশলের দিকে এগোচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধের চরিত্রও বদলে যাচ্ছে- যেখানে প্রযুক্তি, অপ্রচলিত কৌশল এবং অর্থনৈতিক চাপ ক্রমশ নির্ধারক হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে সামরিক শক্তি বা শুধু অস্ত্রের পরিমাণ দিয়ে যুদ্ধের বিজয় নির্ধারিত হয় না, বরং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরান দেখাতে পেরেছে যে আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য সত্ত্বেও তারা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বুঝেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে আগের মতো একতরফা আধিপত্য বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে আরব বিশ্বে, যেখানে এখন ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে যে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং কখনও কখনও তা নিজ ভূখণ্ডকেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। ফলে ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্য হয়তো এমন এক নতুন ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে একক পরাশক্তির আধিপত্যের বদলে আঞ্চলিক সমঝোতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং বহুমুখী জোট রাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
খন্দকার মো. মাহফুজুল হক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
- বিষয় :
- ইরান
