রাজনীতি
তৃণমূলের কাছে সরকারের জবাবদিহি যেভাবে সম্ভব
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের উন্মুক্ত স্থানে সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান
জাহেদুল আলম হিটো
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ১২:৪২ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ২০:০০
গণতন্ত্রে ‘জবাবদিহিতা’ বা ‘কৈফিয়ত’ গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করতে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের কৈফিয়তের ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকা জরুরি। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন, যেখানে ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ এবং জবাবদিহিতা হলো তাদের কাছে শাসকদের দায়বদ্ধতা। স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, স্বাধীন গণমাধ্যম ও নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার তার সিদ্ধান্ত ও কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করে। এই দায়বদ্ধতা দুর্নীতি কমায় এবং সুশাসন নিশ্চিত করে।
গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে এবং ভোটের মাধ্যমে তাদের কর্মক্ষমতার বিচার করে। কোনো সরকার বা কর্মকর্তা আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সবাই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আইনের শাসনের মাধ্যমে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রে এটি নিশ্চিত করা হয়। স্বচ্ছতা ও অবাধ তথ্য প্রবাহের মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে তাই স্বচ্ছতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাষ্ট্রে ক্ষমতার পৃথককরণ কার্যকর জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সহজতর হয়। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সরকারের কাজের সমালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। কার্যকর গণতন্ত্রে জবাবদিহিতা শুধু আর্থিক নয়, বরং নীতিগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেরও অন্তর্ভুক্ত, যা জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
জবাবদিহিতা বা কৈফিয়তকে প্রতিটি ধর্মেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কৈফিয়ত মূলত নিজের বিশ্বাসকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা, ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং জীবনের শুদ্ধি অর্জনের প্রক্রিয়া। ইসলামে ‘কৈফিয়ত’ বা জবাবদিহিতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ঈমান, আমল ও আখলাকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইসলামে আল্লাহ ও সৃষ্টির নিকট কৈফিয়তকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষকে তার কর্ম, সময়, সম্পদ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে তা কোরআন ও হাদিসে বারবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে খাঁটি মুনাফেকরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং কৈফিয়ত দিতে পছন্দ করে না। সহজ কথায় ইসলামের দৃষ্টিতে ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখাই হলো প্রকৃত কৈফিয়ত।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে স্থায়ী ভিত্তি দিতে হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্রে মূলত জবাবদিহিতার সংকটই শাসককে ফ্যাসিস্ট হিসেবে গড়ে তোলে। বিগত বছরগুলোতে আমরা যা অত্যন্ত কষ্টের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারিতে সংসদ ভবনের উন্মুক্ত স্থানে সরকারের শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা বা কৈফিয়তের বোধকে স্পষ্ট করেছে। গত ৯ মে ঢাকার ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের জেলা-মহানগর পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতবিনিময় সভাটিও গণতন্ত্রকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে মাইলফলক হিসেবে স্মরিত হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদের সভাপতিত্বে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের অংশগ্রহণে রুদ্ধদ্বার এই সভায় দলের তৃণমূলের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভার শুরুতে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত তৃণমূল প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বক্তৃতা দেন। সভায় ১৩ জন মন্ত্রী তাদের মন্ত্রণালয় সম্পর্কে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। প্রতিজন মন্ত্রীর বক্তৃতার পরে ৬-৮ জন প্রতিনিধি মন্ত্রীদের প্রশ্ন করার সুযোগ পান। সমাপনী বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমাপ্তি নয়, সভা মুলতবির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বছরে অন্তত ৩টি করে এ ধরনের সভা অনুষ্ঠিত হবে। ভবিষ্যতে থানা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও এ সভায় যুক্ত হবেন। সভার ব্যাপ্তি বেড়ে হবে দুই দিন।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে এই কর্মসূচি জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করতে নিঃসন্দেহে সহায়ক হবে।
জাহেদুল আলম হিটো: মানবাধিকার ও রাজনৈতিক কর্মী
- বিষয় :
- সরকার
- জনগণের কাছে জবাবদিহি
- জবাবদিহিতা
