তালেবানের শাসন
আফগানিস্তানে নারী শিক্ষা ও মানবাধিকার
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ২০:১৫
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুল দখল করে। তারা প্রথম দিকে বলেছিল, মেয়েরা ’ইসলামি কাঠামোর মধ্যে’ পড়ালেখা করতে পারবে। এই আশ্বাসে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্রথমে আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছেলেদের স্কুল খুললো ঠিকেই কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের ফিরতে দেওয়া হলো না। তালেবান কর্মকর্তারা দাবি করলেন, এটা সাময়িক, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে’ মেয়েরা ফিরবে। কিন্তু সেটা আর অদ্যাবধি হয়নি।
ডিক্রি-ফরমানের নিষেধাজ্ঞার কালপঞ্জি
২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তালেবানের জারি করা মোট ৮০টি ডিক্রির মধ্যে ৫৪টি সরাসরি নারীদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। তালেবান এটিকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় কার্যকর করেছে।
২০২১ সালের আগস্ট: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গভিত্তিক পৃথককরণ ঘোষণা। পুরুষ শিক্ষকরা মেয়েদের আর পড়াতে পারবেন না।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর: কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়া ও পড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়।
২০২২ সালের মার্চ: তালেবান ঘোষণা দিল মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় পুনরায় খুলবে। কিন্তু স্কুল খোলার দিনে মেয়েরা স্কুল পৌঁছানোর পর হঠাৎ নির্দেশ এলো স্কুল বন্ধ করতে। এই প্রতিশ্রুতি ভাঙার ঘটনা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।
২০২২ সালের মে: সরকারের ধর্মীয় মন্ত্রণালয় ডিক্রি জারি করে যে, প্রকাশ্যে বের হলে নারীদের সম্পূর্ণ পর্দায় থাকতে হবে, হয় বোরখা নয় নিকাব। এই নিয়ম না মানলে নারীর পুরুষ অভিভাবকদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর: তালেবান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। নারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। যে অধ্যাপকরা প্রতিবাদ করলেন, তাদের হুমকি দেওয়া হলো বা চাকরি গেল। এই নিষেধাজ্ঞায় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া প্রায় এক লাখ নারী শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলেন।
২০২৩ সালের জানুয়ারি: তালেবান মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়াও নিষিদ্ধ করল।
২০২৪ সালের আগস্ট: "ভার্চু অ্যান্ড ভাইস ল" নামে একটি আইন পাস হয়, যা এই সব শিক্ষা-নিষেধাজ্ঞাকে লিখিত আইনে পরিণত করে।
ডিক্রিগুলো নিষিদ্ধ করেছে সহশিক্ষা, মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাংবাদিকতা, আইন, কৃষি, পশুচিকিৎসা ও অর্থনীতির মতো বেশ কিছু বিষয়।
কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র। ২০২২ সালের মার্চে হাইবাতুল্লাহর মৌখিক আদেশে নারীদের দফতরে আসা নিষিদ্ধ করা হয়। ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক এনজিওতে নারীদের কাজ করা নিষিদ্ধ হলো।
চলাফেরার স্বাধীনতাও নেই। একটি ডিক্রিতে বলা হয়েছে, ৭৭ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভ্রমণ করতে হলে নারীকে পুরুষ অভিভাবক নিতে হবে। কিন্তু দেশের অনেক অংশে এটি আরো কম দূরত্বেও কার্যকর, এমনকি একাকী চলাফেরায় চেকপোস্টে জিজ্ঞাসাবাদেরও শিকার হতে হয়।
শিক্ষা পরিসংখ্যানের অতীত ও বর্তমান চিত্র
২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই দশকে আফগানিস্তানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দশগুণ বেড়েছিল। ২০০১ সালে কার্যত কোনো মেয়েই স্কুলে ছিল না; দুই দশকে প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ৮০ শতাংশে পৌঁছেছিল। নারীদের সাক্ষরতার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৭ থেকে ৩০ শতাংশে উঠেছিল।
২০২০-২১ সালে আফগানিস্তানে ১৮,৭৬৫টি সরকারি-বেসরকারি স্কুল চালু ছিল। দুই লক্ষেরও বেশি শিক্ষক ছিলেন, যার মধ্যে ৮০,৫৫৪ জন ছিলেন নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লক্ষেরও বেশি নারী শিক্ষার্থী ছিলেন।
তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর তরুণ আফগান নারীদের ৭৮ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নেই, যা তরুণ পুরুষদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি।
বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য ও সহিংসতা
শিক্ষাবঞ্চনা শুধু জ্ঞানহীনতার সমস্যা নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সমাজে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাল্যবিবাহের হার তিনগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৮৫ শতাংশ আফগান দিনে এক ডলারেরও কম আয়ে জীবনযাপন করছেন।
২০২৩ সালের তথ্যে দেখা গেছে, ১৮ বছরের কম বয়সী ২৮.৭ শতাংশ আফগান মেয়ে বিবাহিত, এবং ৯.৬ শতাংশের বয়স ১৫ বছরেরও কম। চরম দারিদ্র্যের মুখে পরিবারগুলো মেয়েদের বিয়ে দেওয়াকে বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে বেছে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ আফগান নারী পারিবারিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন।
২০২৫ সালের ৮ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-২ তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এবং প্রধান বিচারপতি আব্দুল হাকিম হাক্কানির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। আদালত রায় দিয়েছে যে এই দুইজন নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে লিঙ্গীয় ভিত্তিতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, তালেবান নারীদের শিক্ষার অধিকার, গোপনীয়তার অধিকার, পারিবারিক জীবনের অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত করেছে। তালেবান এই পরোয়ানাকে ’ভিত্তিহীন বক্তব্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে তারা আইসিসির কর্তৃত্ব মানে না।
আফগানিস্তান এখন পৃথিবীতে একমাত্র দেশ
আফগানিস্তান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে নারীদের উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ। এমনকি তালেবানের প্রথম শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) কিছুটা গোপন শিক্ষার সুযোগ ছিল। বর্তমান নিষেধাজ্ঞা সেই তুলনায় আরো ব্যাপক ও কঠোরভাবে কার্যকর। ২০২২ সালের মার্চের ডিক্রির পর থেকে আফগানিস্তান পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে চিহ্নিত যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ করেছে। নারী লেখকদের বইসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৭শ একাডেমিক বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বইপত্র ও চিন্তার স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, ২০২১ সালের নভেম্বরে নারীদের টেলিভিশন নাটকে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হলো। ২০২২ সালের মে মাসে নারী সংবাদ উপস্থাপকদের মুখ ঢেকে সম্প্রচার করতে বলা হলো। ২০২৩ সালের জুনে পুরুষ উপস্থাপকের অনুষ্ঠানে নারী অতিথির অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হলো।
২০২৪ সালের "ভার্চু অ্যান্ড ভাইস" আইনে মানবিক অবয়বের যেকোনো প্রতিনিধিত্ব নিষিদ্ধ এবং রেডিওতে নারীর কণ্ঠস্বর প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে মিডিয়ায় কাজ করা ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী তাদের চাকরি হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইম্যান বলছে, তালেবান নারী ও মেয়েদের জীবনের স্বায়ত্তশাসন, অধিকার ও অস্তিত্বকে লক্ষ্য করে কমপক্ষে ৭০টি ডিক্রি ও নির্দেশনা জারি করেছে।
ইউনেস্কো নিজেই আফগানিস্তানের ২,৬০০টিরও বেশি গ্রামে বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে, কারণ মূল শিক্ষাব্যবস্থায় মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
পাকিস্তানের ইসলামি পণ্ডিত তাকি উসমানি এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান — উভয়েই আফগানিস্তানে নারীশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞাকে ‘অ-ইসলামি’ বলে সমালোচনা করেছেন এবং তালেবানকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো
আফগানিস্তানে যা হচ্ছে তা কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়। ইসলামের নামে যে শাসন সেখানে চলছে, তাকে বিশ্বের অন্যতম ইসলামি পণ্ডিতরাও সমর্থন করেন না।
সত্যকে অস্বীকার করার অধিকার সকলের আছে। কিন্তু যে ২২ লাখ আফগান মেয়ে আজ ষষ্ঠ শ্রেণীর পর স্কুলে যেতে পারছে না, তাদের বঞ্চনা অস্বীকার করলেই মুছে যায় না।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আফগানিস্তান
- তালেবান
- শিক্ষা
- নারী শিক্ষার্থী
