জাতীয় সম্পদ
একই সমুদ্রে ভারত-মিয়ানমার গ্যাস পেলেও বাংলাদেশ পেল না
মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমার আন্দামান সাগরে ১০০ টিসিএফের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে (বণিক বার্তা, ১৬ জুন, ২৬)। ২৩ বছর আগে দেশটি বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিনের নিকটবর্তী এলাকায় প্রায় পাঁচ টিসিএফ গ্যাসের খনি পেয়ে সেই গ্যাস গণচীনে রপ্তানিও করে চলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় একই গ্যাস কাঠামোর বাংলাদেশ অংশে এখনও কোনো গ্যাস পাওয়া গেল না কেন?
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেন্টমার্টিন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানি জাহাজভর্তি সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হয়; কিন্তু মিয়ানমারের নৌবাহিনী তাদের ফিরে আসতে বাধ্য করেছিল। মিয়ানমার দাবি করেছিল, এলাকাটি তাদের। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মামলা জেতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণাধিকার (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন) অর্জন করে। এর মধ্যে ওই সমুদ্র-এলাকাটিও আছে, যেখান থেকে দাইয়ুকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপরও ওই এলাকায় গ্যাস বা তেল অনুসন্ধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। বস্তুত গত ১২ বা ১৪ বছরে এই বিশাল সমুদ্রসীমায় শুধু তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নয়; অন্য কোনো সম্পদ আহরণেরও প্রক্রিয়া দেখা যায়নি। যদিও ওই সময়ে ব্লু ইকোনমি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারের নামে কোটি কোটি ডলার ব্যয়
করা হয়েছে।
এর আসল কারণ ছিল কয়েকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে অন্যায় সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা। এসব ব্যবসায়ীর স্বার্থেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গত দেড় দশকে আমদানীকৃত এলএনজি-নির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছে, যে ব্যবসায়ের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল একচেটিয়া। তাদের মুনাফাবাজিকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে দেশের স্থলভাগ এবং বিপুল সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে অবহেলা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে এটাও বলা দরকার, ভারত মিয়ানমারের ওই পাঁচ টিসিএফ গ্যাসের একটা অংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের স্থলভাগ দিয়ে নিয়ে যেতে উৎসাহী ছিল। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী ‘হুইলিং চার্জ’ পেত। উপরন্তু প্রয়োজনমতো গ্যাস ওখান থেকে আন্তর্জাতিক দামে কিনে নিতে পারত। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু তুলে সে প্রস্তাবে বাংলাদেশ রাজি হয়নি। প্রস্তাবটি মান্যতা পেলে আজকে হয়তো দেশে কোনো গ্যাস সংকট হতো না। এখন প্রতিবছর বাংলাদেশকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে এলএনজি ও কয়লা আমদানি বাবদ।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সমুদ্র তলদেশের ভূ-কাঠামো বিবেচনায় একই কাঠামো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও রয়েছে। তাই এ রূপ গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও বিস্তৃত থাকার কথা। এটা সত্য, ভারতের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ওএনজিসিকে তৎকালীন সরকার মিয়ানমারের দাবীকৃত এলাকার কাছাকাছি দুটো ব্লকে অনুসন্ধান চালানোর জন্য ইজারাদার নিয়োগ করেছিল। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় কোম্পানিটি প্রায় নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এমনকি সেখানে কোনো গ্যাস নেই বলে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশ ওই এলাকা থেকে গ্যাস উত্তোলন করলে ভারতের গোদাবরী বেসিন গ্যাসক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই ওই রহস্যময় নীরবতা!
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সমুদ্র সীমান্তের অদূরে ভারত গোদাবরী বেসিন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে বিরাট গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে গ্যাস উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ওএনজিসি বাংলাদেশ সমুদ্রসীমায় এক দশকে কোনো গ্যাসক্ষেত্রই পেল না!

মোদ্দাকথা, আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশাল সমুদ্র এলাকা পেয়ে যাওয়ার পর গত ১৪ বা ১২ বছরে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকার ব্লকগুলোতে কোনো তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না চালানো শুধু রহস্যজনক বললে কম বলা হবে। ওটাকে জাতির সঙ্গে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা বলাই শ্রেয়। এমনকি বাংলাদেশ ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিজেদের সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার জন্য একটি মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারেনি। কয়েক বছর আগে মার্কিন বহুজাতিক তেল কোম্পানি এক্সন-মবিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র এলাকার ১৫টি ব্লকে তেল অনুসন্ধানের আগ্রহ দেখিয়েছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এ সংক্রান্ত টেন্ডারে তারা অংশগ্রহণই করেনি। তাই তাদের কর্মকাণ্ডকেও রহস্যজনক বলা চলে। এ ব্যাপারে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা বর্তমান সরকারের জন্য ‘ফরজ’ হয়ে পড়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
মিয়ানমার কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধের কবলে এবং দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্রোহী নানা গোষ্ঠীর কাছে সিংহভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তারপরও সীমানা নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধানে মনোযোগ হারায়নি মিয়ানমার সরকার। বিনিয়োগ করেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। প্রয়োজনমতো বিদেশি বিনিয়োগও তারা পেয়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার পরও বাংলাদেশ সময়ক্ষেপণ করেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে। গভীর সাগরে নিজ সীমানায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি বিনিয়োগের নানা গল্প শুনিয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে দেখা যায়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ। ফলে দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকার জ্বালানি সম্ভার এখনও অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে।
আশার বিষয়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এই বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। গত জুন মাসে মালয়েশিয়া ও গণচীন সফরের সময় এ দুটো দেশকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অফ-শোর ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। চীন যেহেতু মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় গ্যাস আহরণ করে চলেছে, তাই চীন এ আমন্ত্রণ আদৌ গ্রহণ করবে কিনা বলা যাচ্ছে না। তবে সরকার এতেই থেমে নেই। সম্প্রতি পেট্রোবাংলা সমুদ্রসীমার ব্লকগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করেছে বলে জানা গেছে। ওই টেন্ডারে সত্যি সত্যিই ভালো সাড়া পাওয়া যায় কিনা, দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মতামত