ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

মানবসম্পদ 

শিক্ষার মান ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: উভয় ক্ষেত্রেই দৈন্যদশা

শিক্ষার মান ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: উভয় ক্ষেত্রেই দৈন্যদশা
×

মো. সাইফুজ্জামান রানা

মো. সাইফুজ্জামান রানা

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ২০:২৯

 বিশ্ব যতটুকু এগিয়েছে, আমরা মানে বাংলাদেশিরা কি তার সঙ্গে সমানতালে অগ্রসর হতে পারছি? আমাদের শিশুরা কি যথাযথ জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে বেড়ে উঠছে? আমরা কি তাদের জন্য বিদ্যালয়গুলোয় যথোপযুক্ত শিখন-শেখানো পরিবেশ ও যোগ্য শিক্ষক বা মেন্টর নিশ্চিত করতে পারছি? আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র যথেষ্ট সময়োপযোগী? প্রতিষ্ঠানগুলো কি শিশুকে শিখতে যথাযথ উৎসাহ দিতে পারছে? শিশুরা কি বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা নিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে? আমাদের দেশের বিদ্যালয়ের পাঠ কি শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আলোচনা হবে এক রকম আর যদি না হয়, তাহলে আলোচনা হবে অন্য রকম। 

দেশের বর্তমান শিক্ষার হাল-চাল পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ওপরের বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। কেননা যেখানে কাঙ্ক্ষিত শিখন যোগ্যতার অর্ধেকের বেশি ঘাটতি নিয়ে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে, সেখানে ওপরের প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগের উত্তর নেতিবাচক হবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে এটা সত্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে– শিক্ষার এই অধঃপতন কি চলতেই থাকবে নাকি এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আছে? অনেক ধরনের উপায় আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণ হলো যে কোনো বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। শিখন-শেখানোর জন্য পরিবেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দক্ষ মানবসম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জুড়ি মেলা ভার। অল্প সময়ে অধিকতর দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। অনেকেই হয়তো বলবেন বাংলাদেশেও তো শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে। তাহলে কেন আমাদের শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নিত হচ্ছে না? প্রতিটি প্রশিক্ষণের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। সাধারণত আমরা আশা করি, প্রশিক্ষণ শেষ অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত যোগ্যতাগুলো অর্জিত হবে। তাহলে কি দেশে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যেসব প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো থেকে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না? উত্তর হলো– না। 
যদি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জিত হতো, প্রশিক্ষণগুলো থেকে তাহলে শিশুরা অন্তত শতভাগ না হোক নির্দিষ্ট প্রান্তিকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার বেশির ভাগ যোগ্যতাগুলো অর্জন করে পরবর্তী স্তরে উত্তীর্ণ হতো। প্রাসঙ্গিকভাবে একটি প্রশ্ন এসে যায়, বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচলিত প্রশিক্ষণগুলোর সমস্যা বা দুর্বলতাগুলো আসলে কোথায়? নিম্নমানের শিক্ষোপকরণ? প্রশিক্ষণ সহায়ক ভেন্যুর অভাব, দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব নাকি প্রশিক্ষক নির্বাচনের দুর্বলতা? বিগত দুই দশকের বেশি সময় দেশের শিক্ষা বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলতে পারি, প্রশিক্ষক নির্বাচনের দুর্বলতার কারণে প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা নিয়ে বের হতে পারে না। বিশেষ করে সরকারি প্রশিক্ষণগুলোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক নির্বাচনে হযবরল চিত্র সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। 
সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত প্রশিক্ষণগুলোয় প্রশিক্ষক হিসেবে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রশিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করা হয়। কিন্তু প্রশিক্ষক হতে হলে তার নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষকের ন্যূনতম যোগ্যতাগুলো উপেক্ষা করে প্রশিক্ষক নির্বাচন করা হয়ে থাকে বলেই প্রশিক্ষণ শেষে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফলতা আসে না। প্রথমমতো একজন প্রশিক্ষকের ইতিবাচক আচরণের অধিকারী হতে হবে। তাঁর শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রশিক্ষণ পরিচালনার কৌশল তথা অংশগ্রহণমূলক কলাকৌশল প্রয়োগের দক্ষতা থাকতে হবে। বিষয়গত জ্ঞান থাকতে হবে। অপরের মতামত শোনার প্রতি আগ্রহ থাকতে হবে। অংশগ্রহণকারীদের মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও বোঝার ক্ষমতা থাকা জরুরি। অভিযোজন ক্ষমতা থাকতে হবে। অনেক সময় একটি পরিকল্পনা কাজ না করলে অন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। ভাষা দক্ষতা বিশেষ করে মৌখিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন, প্রক্ষেপণে স্পষ্টতা ও সাবলীলতা থাকা দরকার। একজন শিক্ষক, প্রশাসক বা ব্যবস্থাপক দক্ষ প্রশিক্ষক হতে পারবে না এমন নয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা শিক্ষা বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষক নাও হতে পারেন। 
দেশে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, একজন শিক্ষক (স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়) মানে তিনি একজন ভালো প্রশিক্ষকও। কিন্তু শিক্ষকতা করা আর প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। সাধারণ শ্রেণিকক্ষে আলোচ্য বিষয়ের ধারাবাহিকতা থাকে, পর্যায়ক্রমে শিশুদের শিখতে সহায়তা করতে হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ কক্ষে অল্প সময়ে একাধিক এবং ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে সেশন পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়। শুধু বিষয়গত জ্ঞান থাকলেই চলে না। শিক্ষাবিজ্ঞানসহ অপরাপর জাগতিক নানা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হয়; যা একজন দক্ষ প্রশিক্ষক ছাড়া অনেক সময় একজন শিক্ষকের পক্ষে এটা করা সম্ভব হয় না। তবে এটা ঠিক যে একজন শিক্ষকও দক্ষ প্রশিক্ষক হতে পারেন, যদি তাঁর সেশন পরিচালনার কলাকৌশলের পাশাপাশি প্রশিক্ষকের গুণাবলিগুলো থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সব শিক্ষকের এসব গুণাবলি থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং ভালো শিক্ষকমাত্রই দক্ষ প্রশিক্ষক হবেন, এমন নয়। অন্যদিকে প্রশাসক বা ব্যবস্থাপকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রয়োজ্য। তিনি একজন ভালো প্রশাসক বা ব্যবস্থাপক তাই বলে তিনি ভালো ও দক্ষ প্রশিক্ষক কিন্তু নন। শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষক হতে হলে শিক্ষা বিজ্ঞানের দক্ষতার পাশাপশি বিষয়গত জ্ঞানও থাকতে হবে যথেষ্ট পরিমাণ। তবে এটাও সত্য, কেউ কেউ প্রশাসক হয়েও দক্ষ প্রশিক্ষক হতে পারেন যদি তার প্রশিক্ষকের গুণাবলির পাশাপাশি বিষয়গত জ্ঞান থাকে। 
সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণগুলোয় সাধারণত একটি বড় সংখ্যক প্রশিক্ষক নির্বাচন করা হয়ে থাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভেতর থেকে। এ ক্ষেত্রে তার প্রশিক্ষণ পরিচালনার গুণাবলি আছে কিংবা নেই সেটা বিবেচনা করা হয় না। ফলে প্রশিক্ষণ শেষে যেসব যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল সেগুলো আর অর্জিত হয় না। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব প্রশিক্ষণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রশিক্ষণ কিন্তু সম্পন্ন হচ্ছে। প্রশিক্ষণ যেহেতু হয়েছে টাকাও ব্যয় হয়েছে। তাই তো প্রতিবছর শিক্ষক প্রশিক্ষণ ঠিকই হয় কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ে না। শিশুরা নির্ধারিত যোগ্যতার থেকে কম যোগ্যতা নিয়ে পরের স্তরে উত্তীর্ণ হয়। শিখন ঘাটতি নিয়ে দুই-তিন বছর অগ্রসর হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে।
শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির সঙ্গে প্রশিক্ষণ ছাড়াও আরও অনেক বিষয় যুক্ত আছে। কিন্তু শিক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক নির্বাচনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। প্রশিক্ষণে একজন দক্ষ প্রশিক্ষকই পারেন দায়িত্ববান ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি করতে। দায়িত্ববান, সচেতন ও দক্ষ শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন আদৌ কি সম্ভব?

মো. সাইফুজ্জামান রানা: গবেষক এবং শিক্ষা উন্নয়নকর্মী
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×