ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তান শান্তির সুযোগ হারাল!

আফগানিস্তান শান্তির সুযোগ হারাল!
×

আসিফ দুররানি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি– ২০২২ সালেই জাতিসংঘ এমন সতর্ক করেছিল। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; লাখ লাখ মানুষ জীবিকা হারায় এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি খাদের কিনারে দাঁড়ায়। দেশটিতে এমনিতেই দক্ষ পেশাজীবীদের অভাব। তার ওপর তারা তখন দলে দলে দেশ ছাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে নারীদের জনপরিসর থেকে ক্রমে বাদ দেওয়া হয়। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করা হয় এবং দারিদ্র্য আফগান সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। শুরুর দিকের সেই সতর্কবার্তা কেবল সত্যই প্রমাণিত হয়নি, বরং বছর বছর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

আজকের আফগানিস্তান সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্যতম বৈপরীত্যের উদাহরণ। তালেবানরা চার দশক ধরে চলা বিদ্রোহের অবসান ঘটাতে সফল হয়েছে এবং এখন তারা প্রায় পুরো দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আগের প্রজাতন্ত্রের শেষ বছরগুলোর তুলনায় সশস্ত্র সংঘাত এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। অথচ এই সামরিক বিজয় দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বা জাতীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত কমতে থাকলেও আফগানিস্তানের অর্থনীতি হয়তো কিছুটা স্থিতিশীল রূপ নিয়েছে। তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর অর্থনীতিতে যে নজিরবিহীন ধস নেমেছিল, তা কাটিয়ে এখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে; মূল্যস্ফীতি কমেছে এবং সামান্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরে এসেছে। তবে এই আশাব্যঞ্জক সূচকগুলোর আড়ালে একটি কঠোর বাস্তব সত্য লুকিয়ে আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি অনেক বেশি; বিদেশি সাহায্য ক্রমাগত কমছে, বেকারত্ব সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বলতে গেলে একেবারেই নেই। এর ফলে দেশটিতে যা তৈরি হয়েছে, তাকে সবচেয়ে ভালো বলা যায়– ‘সমৃদ্ধিহীন স্থিতিশীলতা’।

দেশটির মানবিক পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মতে, ২০২৬ সালে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ আফগানের প্রতি দুজনের একজনের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। লাখ লাখ মানুষ এখনও তীব্র খাদ্যকষ্টে ভুগছে। শিশুদের অপুষ্টির হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। আফগানিস্তানে এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি একটি রূঢ় সত্যকেই মনে করিয়ে দেয়– শান্তি একা মানুষের পেট ভরাতে পারে না; কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না কিংবা মানুষের মর্যাদাও ফিরিয়ে দিতে পারে না। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মানবিক সাহায্য এখন টেকসই উন্নয়নের সেতু না হয়ে উল্টো উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবশ্যই বড় কৃতিত্বের দাবিদার। তাদের খাদ্য সহায়তা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, নগদ অর্থ প্রদান এবং জীবিকা উন্নয়ন কর্মসূচি বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। এই ত্রাণ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছে ঠিকই, কিন্তু কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করছে না; আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করছে না; বিনিয়োগ টানছে না কিংবা জনগণের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনছে না। 
এই পরিস্থিতির আংশিক দায় নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়। উন্নয়ন সহায়তা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া; তালেবান প্রশাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ; আফগানিস্তানের আর্থিক সম্পদ অবরুদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করার যৌথ পরিণতিতে এই সমাজ যে কোনো যুদ্ধপরবর্তী দেশের তুলনায় সবচেয়ে তীব্র অর্থনৈতিক সংকোচনের মুখোমুখি। যদিও এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল তালেবানকে বৈধতা না দেওয়া, কিন্তু এর মূল শিকার হয়েছে সাধারণ আফগান নাগরিক। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞার অজুহাত দিয়ে আফগানিস্তানের এই ধারাবাহিক অবনতিকে আড়াল করা যাবে না।

টিটিপি, আইএস-কে, ইটিআইএম, আইএমইউ, বিএলএ এবং আরও বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠনের উপস্থিতি দেশটির ব্যাপক কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলছে– আফগানিস্তান তার মাটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সত্যিই পূরণ করছে কিনা। যতক্ষণ এই বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান না মিলছে, ততক্ষণ অর্থপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বাভাবিকীকরণ অধরাই থেকে যাবে।
আফগানিস্তানে তালেবান শাসন এখন দারিদ্র্যের সমার্থক। এটি আসলে সামরিক বিজয়কে জাতীয় পুনর্জাগরণে রূপান্তর করতে সক্ষম একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার অভাবের ফল। যতক্ষণ তালেবান এবং বাকি বিশ্ব শুধু সংকট সামাল দেওয়ার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে না আসবে, ততক্ষণ আফগানিস্তানের ভাগ্য ‘সমৃদ্ধিহীন স্থিতিশীলতা’ এবং ‘প্রগতিহীন শান্তি’র চক্রেই আটকা পড়ে থাকবে।

আসিফ দুররানি: আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি; দ্য ডন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×