ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

সাতক্ষীরার উপকূলবাসীর জীবনযুদ্ধ

সাতক্ষীরার উপকূলবাসীর জীবনযুদ্ধ
×

মো. ইমদাদুল

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম, রূঢ় ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়। শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী কিংবা আশাশুনির বিস্তীর্ণ জনপদে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং এখানকার মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার রূঢ় বাস্তবতা। সিডর, আইলা, আম্পান ও রিমালের মতো ঘন ঘন আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় কেবল উপকূলের ঘরবাড়িই ধ্বংস করেনি; এখানকার মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সামগ্রিক ভিত্তিকেও সম্পূর্ণরূপে নাড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তীব্র লবণাক্ততার ক্রমাগত আগ্রাসনে এ অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন এখন অন্তহীন ও টেকসইহীন জীবনযুদ্ধের নাম।

সাতক্ষীরার এই সংকটের প্রধান দিক হলো তীব্র অর্থনৈতিক ও কৃষিগত বিপর্যয়। একসময় যে উর্বর জমিতে প্রচুর ধান, পাট ও শাকসবজি উৎপাদিত হতো; লবণাক্ততার বিস্তারের ফলে তা আজ বিশাল চিংড়ি ও কাঁকড়া ঘেরে রূপান্তরিত। শুরুতে লাভজনক মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই নোনাপানি মাটির উর্বরতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিচ্ছে এবং প্রথাগত কৃষিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বহু প্রান্তিক কৃষক শেষ পর্যন্ত জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটিতেই ভূমিহীন ও মজুরে পরিণত হচ্ছেন, যা স্থানীয়ভাবে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অসন্তোষ ও পারিবারিক কাঠামোতে ফাটল সৃষ্টি করছে।
সবচেয়ে বড় ও তীব্র মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির ক্ষেত্রে। চারদিকে অথই পানি থাকলেও পানের যোগ্য এক ফোঁটা নিরাপদ পানি নেই। ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিকাংশ অগভীর নলকূপ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে উপকূলের নারীদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। এই পানির সংকট এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। লবণাক্ত পানি পানের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রিএকলাম্পসিয়া ও প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত নানা জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

পাশাপাশি স্যানিটেশন ও ওয়াশ নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারীদের মানসিক চাপ, জরায়ু-সংশ্লিষ্ট রোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তীব্র হচ্ছে। জীবিকার চরম সংকটে বাধ্য হয়ে কর্মক্ষম পুরুষ ও যুবক দলে দলে ঢাকা বা খুলনার মতো বড় শহরে কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে গ্রামগুলো এখন পুরুষশূন্য হয়ে কেবল অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে, যা জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির এক ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।

এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কোনো অস্থায়ী প্রকল্প, দাতাগোষ্ঠীর তহবিল বা শুধু ত্রাণের মানসিকতা দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মহাপরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরচালিত পানি শোধন ব্যবস্থা, লবণ-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
সর্বোপরি, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে নারীর স্বাস্থ্য, অধিকার ও নিরাপত্তাকে স্থান দিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থের সঠিক, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সাতক্ষীরার মানুষ অনুদান নয়; তারা নিরাপদ পানি, নিরাপদ বসতি, টেকসই জীবিকা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার চান। উপকূলের এই সংকট শুধু সাতক্ষীরার নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ যদি আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তাহলে একদিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, হারিয়ে যাবে হাজারো মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। উপকূলের এই অস্তিত্বের লড়াই আজ শুধু সাতক্ষীরার নয়; পুরো বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রশ্ন।

মো. ইমদাদুল হক: সম্পাদক, অন্ত্যজ পরিষদ, সাতক্ষীরা

আরও পড়ুন

×