সক্ষমতা
জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক জরুরি
এমএন ইসলাম
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল রূপান্তরের নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে। গত এক দশকে অনলাইন পাবলিক সার্ভিস, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রশাসনিক অটোমেশন, নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মতো বিষয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আইসিটি এখন জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এসব ব্যবস্থাকে দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ও টেকসই করে তোলা। এ কারণেই বাংলাদেশের সব সরকারি খাতের প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য এখন একটি জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন।
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে অনেক সরকারি আইসিটি সিস্টেম তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেখানে সমন্বয় সীমিত, প্রযুক্তি কাঠামো ভিন্ন, নথিবদ্ধকরণে অসামঞ্জস্য ও দুর্বলতা দেখা যায়। এই খণ্ডিত পদ্ধতি দেশের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেমের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থা প্রায় একই ধরনের প্ল্যাটফর্ম, মডিউল, ডেটাবেজ এবং সেবা প্রদান ব্যবস্থা আলাদাভাবে তৈরি করে। এতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জাতীয় ডিজিটাল কম্পোনেন্ট তৈরি করার পরিবর্তে অনেক সময় নির্দিষ্ট প্রকল্প বা নির্দিষ্ট সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সরকার উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আপগ্রেডের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্বল আন্তঃসংযোগ স্থাপন, যখন বিভিন্ন সরকারি সিস্টেম একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তথ্য বিনিময় কঠিন হয়ে পড়ে। নাগরিকদের একই তথ্য বিভিন্ন সংস্থায় বারবার জমা দিতে হতে পারে। ভেন্ডর নির্ভরতাও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। যখন সোর্স কোডের মালিকানা, ডকুমেন্টেশন, ওপেন এপিআই, ডিপ্লয়মেন্ট গাইডলাইন এবং রক্ষণাবেক্ষণ নীতির জন্য স্পষ্ট মানদণ্ড ছাড়া সফটওয়্যার সিস্টেম তৈরি করা হয়, তখন সরকারি সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট ভেন্ডরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে সিস্টেম আপগ্রেড, ইন্টিগ্রেশন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। সাইবার নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি খাতের সিস্টেমগুলো প্রায়ই নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য, আর্থিক তথ্য, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং জাতীয় পর্যায়ের অপারেশনাল ডেটা পরিচালনা করে। যদি বিভিন্ন সিস্টেম ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে সামগ্রিক জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
তাই প্রতিটি সরকারি আইসিটি প্রকল্পে বাধ্যতামূলক সাইবার নিরাপত্তা ভিত্তিমূলক মানদণ্ড থাকা উচিত। এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা উচিত। যেখানে প্রধান লক্ষ্য হবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পভিত্তিক ডেলিভারি থেকে সরে সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার তৈরি করা। এ ধরনের আর্কিটেকচার সরকারি সিস্টেমগুলোকে সংযুক্ত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, নিরাপদ এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য করতে সহায়তা করবে। একটি শক্তিশালী জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো উচিত।
বাংলাদেশকে এমন পুনর্ব্যবহারযোগ্য সরকারি মডিউল তৈরি করতে হবে, যা বিভিন্ন সংস্থায় ব্যবহার করা যায়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য মডিউলভিত্তিক পদ্ধতি ব্যয় কমাতে, মান উন্নত করতে এবং সরকারি সেবায় সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে পারে। আন্তঃসংযোগ স্থাপন এবং ডেটা বিনিময়ের ওপর জোর দিতে হবে। স্ট্যান্ডার্ড ডেটা ফরম্যাট, জাতীয় ডেটা ডিকশনারি এবং সম্মতিভিত্তিক ডেটা শেয়ারিং নীতিমালা প্রয়োজন। সরকারি খাতের সিস্টেমগুলোর জন্য নিরাপদ, স্কেলযোগ্য এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরযোগ্য হোস্টিং এনভায়রনমেন্ট প্রয়োজন। সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। আইসিটি প্রকল্পে নিরাপত্তাকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ডিজাইন পর্যায় থেকেই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। আইসিটি ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। এর পাশাপাশি সরকার-অর্থায়িত সব সফটওয়্যার প্রকল্পের সোর্স কোড, এপিআই ডকুমেন্টেশন, ডেটাবেজ স্কিমা, ডিপ্লয়মেন্ট গাইড, অডিট রিপোর্ট এবং ভার্সন হিস্ট্রি যথাযথ অ্যাকসেস কন্ট্রোলডের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় রিপোজিটরিতে সংরক্ষণ করা উচিত। এটি জাতীয় ডিজিটাল সম্পদ সুরক্ষিত করবে; সরকারি মালিকানা নিশ্চিত করবে; ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করবে। এরপর বলতে হবে স্থানীয় আইসিটি শিল্পের উন্নয়নের কথা।
একটি জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক শুধু সরকারি সিস্টেমকে উন্নত করবে না; বাংলাদেশের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোকেও শক্তিশালী করবে। এতে দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সার্ভিস মার্কেটে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এআই ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ার, প্রজেক্ট ম্যানেজার, বিজনেস অ্যানালিস্ট এবং টেকনিক্যাল সাপোর্ট পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম শুধু আউটসোর্সিং-নির্ভর কাজ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের জটিল প্রযুক্তি প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।
দীর্ঘ মেয়াদে এই ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ডিজিটাল সার্ভিস মার্কেটে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। সরকারি প্রকল্পে অর্জিত অভিজ্ঞতা, তৈরি হওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য মডিউল, স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিমুখী আইসিটি সেবা তৈরিতে সহায়তা করবে। ফলে বাংলাদেশ শুধু সফটওয়্যার আউটসোর্সিং বাজারেই নয়, বরং গভটেক, স্মার্ট সিটি, এআই, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং এন্টারপ্রাইজ অটোমেশনের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
বাংলাদেশকে আগামীতে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা পরিচালনার কথা ভাবতে হবে। এই কর্তৃপক্ষের নাম হতে পারে ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেক্ট অ্যান্ড আইসিটি ফ্রেমওয়ার্ক স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি। এর দায়িত্ব হবে স্ট্যান্ডার্ড অনুমোদন, বড় আইসিটি প্রকল্প পর্যালোচনা, কোড রিপোজিটরি নীতি পরিচালনা, সরকারি ক্লাউড কৌশল ও এআই নীতিমালার নির্দেশনা দেওয়া, সাইবার নিরাপত্তা কমপ্লায়েন্স পর্যবেক্ষণ, ক্রয় মূল্যায়নে সহায়তা এবং বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
এমএন ইসলাম: কোরিয়াপ্রবাসী
তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা
[email protected]
- বিষয় :
- মতামত