উচ্চারণের বিপরীতে
ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সহিষ্ণু সমাজ
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১১:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি। গুম, খুন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বাকস্বাধীনতা হরণসহ নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ আইনের শাসনের সন্ধানে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে বহু আকাঙ্ক্ষিত আইনের শাসন সোনার পাথরবাটি হয়েই থাকে। পরিবর্তে মব সন্ত্রাসসহ যত্রতত্র ট্যাগবাজি, দলীয়করণ ও গোষ্ঠীতন্ত্র জনসাধারণের জীবনে জেঁকে বসে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সরকারের সময়ও আইনের শাসন দূরের পথ বলেই মনে হচ্ছে।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় সংগঠনটি বলছে, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা হকার উচ্ছেদ থেকে শুরু করে একাধিক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে। নানা সময়ে তারা শাহবাগে ‘মব’ করে অন্য শিক্ষার্থীদের মারধর করে থানায় দিয়েছে। সবটাই যেন ছাত্রলীগের আমলে শিবির সন্দেহে পেটানো এবং শাহবাগ থানায় মামলা দেওয়ার স্ক্রিপ্টের পুনরাবৃত্তি। এই পরিস্থিতি নির্বাচিত সরকারের আমলে খুব বেশি পাল্টেছে বলে মনে হয় না।’
এ দেশে কমবেশি মব সন্ত্রাসের উপস্থিতি ছিল। বিশেষত আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড ও আবরার হত্যাকাণ্ড এরই ধারাবাহিকতা। অবশ্য দুই ঘটনাতেই বিচার সম্পন্ন হয়; হত্যাকারীরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কিন্তু মব সন্ত্রাসকে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পক্ষে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই আমলে মব সন্ত্রাসের বিচারের উদাহরণ নেই। বরং মব সন্ত্রাসীদের ‘প্রেশার গ্রুপ’ আখ্যা দেওয়া হয়। গোলটেবিলে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকেও বলা হয়– ‘প্রেশার গ্রুপ নাম দিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নীতি পুলিশিংকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।’
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছরে পাঁচবার উপাচার্য বদল হয়েছে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্য বদলের এই ঘটনা নিয়মিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক অস্থিতিশীলতা তৈরিতে শিক্ষক রাজনীতির কৃষ্ণবৃত্ত অনেকাংশে দায়ী, সন্দেহ নেই। জাতীয় রাজনীতির ক্রীড়নক হয়ে থাকা ছাত্র রাজনীতিও এই অস্থিতিশীলতার অংশীদার। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুন, নির্যাতন, নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতা ও অর্থের সম্পর্ক সুষ্পষ্ট। অচলায়তন থেকে বেরিয়ে আসবার পথও অচেনা নয়। কিন্তু সেই পুরোনো কথা– বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
২.
গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে ঝোপে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর হাজার হাজার ছাত্রীর মিছিলে প্রকম্পিত হয় ক্যাম্পাস– ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষণ করে, প্রক্টর কী করে?’ ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রলীগ নেতা মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরির ঘটনায় একই স্লোগানে মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমারও। দুই যুগ পর একই স্লোগান ও মিছিল জানিয়ে দেয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কীভাবে অপরাধ জিইয়ে রেখেছে। অপরাধীরা বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বৈরী পরিস্থিতি পার করিয়ে দেবে। এভাবে দেশজুড়ে অপরাধের অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়।
গত ১০ মে ভোরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচারা বাজারে গরু চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় জনতা একটি পিকআপ ভ্যানেও আগুন ধরিয়ে দেয়। অন্যদিকে ১৭ মে কক্সবাজারের উখিয়ায় ফেসবুকে ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট নিয়ে ধাওয়া ও হামলার ঘটনায় ছৈয়দা বেগম নিহত হন। বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠেছে (সমকাল, ১৮ মে, ২৬)।
সংবাদমাধ্যমে হামলাকারী জনতার পরিচয় কখনও ‘ক্রুদ্ধ’, কখনও ‘তৌহিদি’, কখনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী। কখনও উন্মত্ত জনতা ভাঙছে মাজার-স্থাপনা; কখনও পিটিয়ে মারছে অভিযুক্তকে। সভ্য দেশের আইনের শাসন সেখানে নির্বাক, নিরুপায়।
৩.
মতামত কিংবা অবস্থানগত কারণে কারও বিরুদ্ধে সমালোচনা বা অভিযোগ থাকতেই পারে। অভিযোগ তদন্ত করবার জন্য আইনি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতিতেই ভয়ের সংস্কৃতি বিকশিত হতে থাকে। গণতন্ত্রহীন সমাজে এর বিস্তার সর্বগ্রাসী হয়, নিকট অতীতে আমরা তা-ই দেখেছি। কিন্তু দেশে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রার পরও ভয়ের সংস্কৃতি যেভাবে থাবা বসিয়ে দিচ্ছে, তার শক্তির উৎস সন্ধান জরুরি।
সামাজিক মাধ্যমে অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার অনুশীলন বর্তমানে বেশি দেখা যায়। তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দেখলাম সামাজিক মাধ্যমে এক দল মানুষ উল্লাস প্রকাশ করে বলছেন, ২৫তম ‘লালবদর’-এর মৃত্যু হলো। একইভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের অন্যদের মৃত্যু বা শোক সংবাদেও বিশ্রী উল্লাস ও অশালীন আক্রোশ দেখা গিয়েছে।

সাধারণ মানবিকবোধ দেশের মানুষের মধ্যে থাকবে না? রুচি, মানবিকতা, সহনশীলতা– সব ভুলে পরস্পরের উদ্দেশে হুঙ্কার ধ্বনি ছেড়ে জয়ী হবার আকাঙ্ক্ষার পরিণতি অরাজক ও অসহিষ্ণু পরিস্থিতি। আইন তার নিজের গতিতে চলবে, তার গতি রুদ্ধ করবে না কেউ। এটাই সুশাসন ও সভ্য সমাজের নিয়ামক। কিন্তু গোষ্ঠী ও দলতন্ত্রে অন্ধ অনুরাগ ভুলিয়ে দিচ্ছে নৈতিকতাবোধ। যখন যে দল ক্ষমতায়, তখন সবাই তার বশংবদ– এই কর্তৃত্ববাদী ভাবনা অগণতান্ত্রিক ক্রিয়াকর্মের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আওয়ামী লীগ আমলে যাত্রার প্যান্ডেল নির্মাতা থেকে ফুটপাতের চা স্টল মালিকদের সংগঠন– হেন কোনো পেশাজীবী সংগঠন নেই, যার নামের শেষে ‘লীগ’ যুক্ত হয়নি। একই প্রক্রিয়া আবারও শুরুর আগেই সরকারের উচিত সতর্ক হওয়া।
পেশাগত সংগঠন অবশ্যই ক্ষতিকর বা বেআইনি নয়। বিপজ্জনক হয় তখনই, যখন প্রেশার গ্রুপের নামে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জোর খাটাতে শুরু করে। সমাজে নীতি পুলিশিং আরেকটি নেতিবাচক শক্তি; শিক্ষাঙ্গন থেকে সমাজের নানা ক্ষেত্রে এই নীতি পুলিশিং জোরদার হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৃষ্ট নীতি পুলিশিংয়ের বিশৃঙ্খলার অনুশীলন কোথাও কোথাও এখনও হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। গাছের বিকাশ শুরু হয় শিকড় থেকেই; আজকের শিশুই আগামী দিনের নাগরিক। আইসিডিডিআরবি,র গবেষণা জানাচ্ছে, রাজধানীর শিশুরা প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে; পিতামাতাদের অবস্থা তথৈবচ। এতে কেবল স্বাস্থ্যহানি নয়; মানসিকসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের বহু কথা আমরা শুনি। এটা জরুরি অবশ্যই। এর চেয়েও জরুরি সামাজিক সংস্কারের আলাপ জারি রাখা। বিদ্যালয়ে সংগীত-চিত্রাঙ্কন-গ্রন্থাগার অনুশীলনের সুবিধা রয়েছে কিনা, এই আলোচনা আজ কোথাও নেই। খেলাধুলার জন্য অনেক বিদ্যালয়ে মাঠ নেই। মাদ্রাসাসহ নানা শিক্ষায়তনে জাতীয় সংগীত অনুশীলন হয় কিনা, আমরা জানতে পারি না। মানবিক বিবেচনা ও বোধ জাগিয়ে তুলবার জন্য অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে ধাপে ধাপে কর্মসূচি ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
যে অসহিষ্ণুতা ও হিংস্রতার উৎপাদন আমাদের চারপাশে বাড়ছে, তার রাশ টেনে ধরবার দায়িত্ব আসলে বিবেকবান প্রত্যেককেই নিতে হবে। তবে মূল কাজটি গণতান্ত্রিক সরকারের সমন্বিত প্রয়াসে সম্পন্ন হতে হবে। একটি বহুমতের হাস্যমুখর ও প্রাণবন্ত জাতি গঠন আকস্মিকভাবে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীল পদক্ষেপ। ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সহিষ্ণু সমাজ গঠনেরও এটি প্রথম পদক্ষেপ।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
