সমকালীন প্রসঙ্গ
কৃষকের কান্না হাওরেরও কান্না
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ১৮:১২
এপ্রিল মাস শুরু হলেই বাংলাদেশের হাওর অববাহিকার বাতাসে উদ্বেগ আর প্রত্যাশার এক মিশ্র অনুভূতি ভেসে বেড়ায়। এ সময় বোরো ধান– জাতির প্রধান খাদ্যের উৎস এক সোনালি ফসল– প্রায় প্রস্তুত থাকে কৃষকের ঘরে ওঠার জন্য। কিন্তু এ বছর, ২০২৬ সালে, মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা উজানের আগাম জলস্রোত এই চিরাচরিত ছন্দ ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ বা কিশোরগঞ্জের কৃষকদের কাছে ওই তীব্র স্রোতের শব্দ শুধু আবহাওয়ার ঘটনা না; এটি এক আসন্ন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ধ্বনি। অন্যদিকে হাওরের ফসলহানি শুধু স্থানীয় দুর্যোগ নয়; এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মেরুদণ্ডে একটি বড় ফাটল। যখন হাওরে বিপন্নতা উপচে পড়ে তখন তার ধাক্কা কাদামাখা ক্ষেত ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। এটি পৌঁছায় ঢাকার চালের বাজারে, চাপ সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এবং উস্কে দেয় বাস্তুচ্যুতদের ঢল জনাকীর্ণ শহুরে বসতিগুলোতে।
বহুদিন ধরে বাংলাদেশ হাওর অঞ্চলকে একটি সংবেদনশীল প্রত্যন্ত মৌসুমি জলাভূমি হিসেবে দেখে এসেছে। জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এটি একটি অগ্রণী ব্যবস্থা। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মতে, হাওরে শুষ্ক রবি মৌসুমে চার লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়, যা দেশের মোট বোরো উৎপাদনের ২০ থেকে ৪৫ ভাগ ফসল সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি বা হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে যখন এই উৎপাদন ব্যর্থ হয় তখন তার পরিণতি আঘাত করে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে। বিগত ৩৬ বছরের উপাত্ত পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক-শিক্ষক ও কৃষি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে এই সময়কালে জলবায়ুর অস্থিরতা হাওরের বোরো ফসলে দশ থেকে একশ ভাগ ধ্বংসের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। কিন্তু এই বছরওয়ারী ধ্বংসের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে সুশাসনের ব্যর্থতায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাওরের পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নষ্ট করার প্রবণতা এবং অবকাঠামো নির্ভর উন্নয়ন মডেল। এই মডেলে হাওরের মতো একটি সংবেদনশীল ও গতিশীল জলাভূমিতে বিগত ২০ বছরে তৈরি করা হয়েছে ইকো সিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রবিনাশী স্থায়ী অবকাঠামো।
তবে হাওরে প্রতিবছর কম-বেশি ফসলহানির পেছনে রয়েছে আরও দুটো প্রচ্ছন্ন কারণ। তার প্রথমটি হলো, হাওরে ফসল বোনা ও কাটার মৌসুমে প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির তীব্র ঘাটতি। এই শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশই আসে হাওর অঞ্চলের বাইরে থেকে। দুই দশক আগেও এই শ্রমশক্তির সরবরাহ ছিল প্রয়োজনীয় চাহিদার সমান সমান। কিন্তু তা প্রতিবছর কমছে আশঙ্কাজনক হারে আর বাড়ছে ক্ষুদ্র ও মধ্য কৃষক এবং ভাগচাষিদের খরচের মাত্রা। দ্বিতীয়টি হলো ফসল নিয়ে এক অকথিত জুয়া খেলা। আর তা খেলছেন হাওরের কৃষকরা। হাওরে লাগানোর জন্য কৃষকদের পছন্দ উচ্চফলনশীল ব্রি ধান ৯২, যা এক হেক্টরে প্রায় ৯ টন ধান দেয়। কিন্তু এতে সময় লাগে প্রায় ১৬০ দিন। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা স্বল্পমেয়াদি অনেক জাত কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বিগত দুই দশকে। এসব জাতের মধ্যে ব্রি ৮৮, ব্রি ১০১, ব্রি ১১৩, ব্রি ১০৫ জাতে সময় লাগে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনের মতো। অর্থাৎ ১৫-২০ দিন কম সময়ে তুলনামূলক নিরাপদে হাওরের ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। কিন্তু এগুলোতে এখনও অনীহা বেশির ভাগ কৃষকের। কারণ এসব জাতের হেক্টরপ্রতি ফলন ব্রি ৯২-এর তুলনায় এক থেকে দেড় টন কম হয়। উৎপাদনশীলতার পরিমাণের প্রতি নজর দিতে গিয়ে আগাম বন্যায় পুরো মাঠের ধান হারানোর ঝুঁকিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশির ভাগ কৃষক। অথচ প্রজন্মগত জ্ঞান থেকে হাওরের কৃষকরা জানেন যে এপ্রিল মাসে ঢলের আশঙ্কা ৪০ ভাগের বেশি থাকে আর মে মাসে তা ৫০ ভাগের বেশি হয়। কিন্তু এই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার জন্য শুধু কৃষকদের দায়ী করে লাভ নেই। এর পেছনে রয়েছে বাজারে ধানের সঠিক দাম না পাওয়া, বিগত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টাসহ অনেক অন্তর্নিহিত কারণ।
ফসল ধ্বংসের তীব্রতা বাড়াচ্ছে হাওর শাসন পদ্ধতি
গত তিন দশকে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মূল্যায়ন থেকে একটি ভয়াবহ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে উজানের অববাহিকাগুলোতে স্বল্পস্থায়ী চরম বৃষ্টির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে তীব্রতর হয়েছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যা ছিল সতর্কবার্তা; ২০২৬ সালের প্রথম দিকেই আগাম ঢল বলছে, এটিই আমাদের জন্য নতুন বাস্তব পরিস্থিতি।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠ না দেখলে চলবে না। হাওর অঞ্চলে স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে গত দুই দশকে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ সত্ত্বেও কেন ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, তা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বা দোহাই দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। হাওরে বারবার এই বিপর্যয় ঘটছে যুগপৎভাবে জলবায়ুগত চাপ এবং শাসন পদ্ধতির দুর্বলতা একত্র হয়ে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী হাওর অঞ্চলে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে পাহাড়ি ঢল প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ শেষ করার কথা, যাতে বাঁধের মাটির দৃঢ়তা তৈরি হয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি যে মার্চের শেষ পর্যন্ত বাঁধের মাটির কাজ চলতেই থাকে। তাড়াহুড়ো করে শেষ করা বাঁধগুলো আরও দুর্বল হয় দুর্নীতিগ্রস্ত তদারকির কারণে। ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রথম বড় ঢেউ প্রতিরোধ করতে এগুলো কাঠামোগতভাবেই অক্ষম থাকে এবং এক বা দুই সপ্তাহ টিকে থাকার বদলে কয়েক ঘণ্টায় ভেঙে পড়ে।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই হাওরের আগাম পাহাড়ি ঢলকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিবার্য ‘প্রাকৃতিক ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, কিন্তু হাওরের কৃষক ও জনগোষ্ঠী একে দেখছেন জবাবদিহির ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতা হিসেবে। হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ঢলের অন্যতম কারণ, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অসততা এই সংকটকে বিপজ্জনক বিপর্যয়ে পরিণত করছে।
‘সুরক্ষার’ রাজনৈতিক অর্থনীতি
হাওরের ফসল রক্ষার ব্যর্থতার পুনরাবৃত্ত চক্র এক উদ্বেগজনক রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্ম দিচ্ছে। বিগত তিন দশকে হাওরের বাঁধ পুনর্বাসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালা হয়েছে, তবুও ফসলের ক্ষতি বেড়েই চলেছে। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে– বিনিয়োগ বাড়লেও কেন হাওরের ক্ষতি প্রতিরোধের স্থিতিশীলতা বাড়ছে না?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, হাওরকে পরিবেশগত ও মানবিক সমস্যার পরিবর্তে একটি প্রকৌশলগত সমস্যার মডেলে দেখা হচ্ছে। হাওরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক না হয়ে প্রায়ই স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বাহনে পরিণত হচ্ছে। ফলে তারা কৃষক তথা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে দুর্নীতিচক্রকেই রক্ষা করে। এ অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চা হাওরে ‘সংকট ব্যবস্থাপনার’ একটি প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বাস্তুতন্ত্রের চাইতে বাঁধ তৈরির জন্য বার্ষিক মাটি সরানোর চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আমরা নিজেরাই যেন এক উভয় সংকট তৈরি করছি– একদিকে পাহাড়ি ঢল প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় এবং পরিবেশবান্ধব স্বল্পমেয়াদি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছি, অন্যদিকে দুর্নীতিচক্র রক্ষা করতে গিয়ে এসব বাঁধ ও ঢল-প্রতিরোধী অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক দুর্বল করে দিচ্ছি।
অবকাঠামো বনাম বাস্তুসংস্থান (ইকোসিস্টেম)
হাওরে আমাদের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভুল হলো একটি ঋতুভিত্তিক ভূখণ্ডে ‘স্থায়ী’ পরিকাঠামো নির্মাণের প্রচেষ্টা। হাওর একটি জলজ বাস্তুতন্ত্র, যা কৃষিকাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। আধুনিক হস্তক্ষেপ যেমন– উঁচু বাঁধ, সব ঋতুতে ব্যবহারযোগ্য রাস্তা, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি হাওরে পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে আধুনিক ব্যবস্থার নামে ঐতিহ্যবাহী জলাভূমির হিজল ও করচের বন রক্ষা না করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছি। এসব প্রাকৃতিক ঢল-প্রতিরোধক ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় আমরা অজান্তেই মাটির রক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলেছি।
হাওরে স্থায়িত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা দরকার
বর্তমানে বাংলাদেশ হাওরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে আছে। হয় তাকে স্থিতিশীল অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পথেই থাকতে হবে অথবা সংবেদনশীল স্থিতিস্থাপকতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে কখনোই স্থায়িত্বকে কংক্রিটের দেয়ালের উচ্চতা বা গাড়ি চলাচলের চকচকে পাকা দিয়ে নয়, বরং পরিবেশ ও প্রতিবেশ উপযোগী শাসন পদ্ধতির স্থায়িত্ব দিয়ে পরিমাপ করা উচিত। এর জন্য হাওর অঞ্চলে তিনটি প্রধান পরিবর্তন প্রয়োজন:
১. অভিযোজনযোগ্য সুরক্ষা: আমাদের অবশ্যই অভিযোজিত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাওরের পানির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো শিখতে হবে, একে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়। স্বল্প উচ্চতার মৌসুমি অবকাঠামো ফসল কাটার মৌসুমে ফসল রক্ষা করতে পারে এবং বর্ষাকালে অববাহিকাকে স্বাভাবিকভাবে নদী ব্যবস্থার সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হতে সাহায্য করে।
২. পরিবেশগত বুদ্ধিমত্তা: হাওরের মতো জলাভূমির বন পুনরুদ্ধার এবং জলাভূমির সংযোগ পুনঃস্থাপন শুধু একটি ‘সবুজ’ প্রকল্প নয়, এগুলো অপরিহার্য প্রকৌশলগত প্রতিবন্ধক। প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান সবসময় একটি নমনীয় স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করে, যা শুধু বাঁধের কাজ দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে হাওরের অববাহিকা কাঠামোর উন্নয়ন ঘটানো এবং এ খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
৩. ‘মানবিকতা’র মাধ্যমে শাসন: হাওরের শাসন পদ্ধতি সংস্কারের জন্য ‘হার্ডওয়্যার’ ভাবনা থেকে বের হয়ে এসে ‘মানবিক’ ভাবনার দিকে অগ্রসর হতে হবে। বাঁধের তত্ত্বাবধানকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থেকে মুক্ত করে স্থানীয় জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের কাছে প্রজন্মগত পরিবেশ ও প্রতিবেশ জ্ঞান রয়েছে। তাদের কাছ থেকে শুধু ‘পরামর্শ’ নিলেই চলবে না, বরং তাদেরকে নিজেদের ভূখণ্ডের প্রধান, প্রযুক্তি-সক্ষম পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম, যাতে করে তারা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু নির্ভরযোগ্য বোরো ফসল করার দিকে এগিয়ে যায়।
ত্রাণ নয়, জবাবদিহি চাই
কয়েক দশক ধরেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বসেরা দেশ হিসেবে প্রশংসিত হয়ে আসছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং গণসংহতি অগণিত জীবন বাঁচিয়েছে এবং দেশকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছে। কিন্তু বারবার ফিরে আসা হাওর সংকট এই খ্যাতিমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মডেলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। এতে মনে হয় যে আমাদের মডেল পরিবেশগত শাসন পদ্ধতির চাইতে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ প্রতিক্রিয়াকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। চ্যালেঞ্জটি এখন শুধু ঢল-প্রতিরোধ নয়; চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চয়তার যুগে পানি, অবকাঠামো, বাস্তুতন্ত্র এবং রাজনৈতিক প্রণোদনাকে সংবেদনশীলভাবে সমন্বিত পরিচালনা করা।
গত তিন দশকে কমপক্ষে দশবার হাওরে ফসলহানির পরিমাণ ৫০ শতাংশ থেকে শতভাগ ছিল। কিন্তু হাওর শুধু অকালবৃষ্টির কারণেই দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। এটি শুধু একটি জলবায়ুজনিত আঞ্চলিক দুর্যোগ নয়। হাওরের বন্যা ও ফসলহানি জাতীয় বিপর্যয় তৈরি করছে। এটি ক্রমশ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ হাওরের শাসন পদ্ধতি তার পরিবেশগত প্রজ্ঞা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা হারিয়েছে। হাওরের আঞ্চলিক বন্যা তাই এখন একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ঝুঁকি, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং বাংলাদেশে জলবায়ু অভিযোজনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা।
হাওর অববাহিকার পরিবেশগত যুক্তিকে উপেক্ষা করে যদি আমরা অস্থায়ী সমাধানে অর্থ ঢালতে থাকি, তবে ক্ষতির চক্র আরও গভীর হবে। তবে বাংলাদেশ যদি জলবায়ু বিজ্ঞান, টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার, জবাবদিহিমূলক শাসন পদ্ধতি এবং প্রকৃতিভিত্তিক স্থিতিস্থাপকতাকে সমন্বয় করতে পারে, তবে হাওর বারবার ব্যর্থতার প্রতীক না হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে অভিযোজনমূলক শাসনের একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। তবে এই মডেলে কৃষকের জন্য পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবস্থা একীভূত করা অত্যাবশ্যক। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে হাওরের কৃষক বাঁচলে হাওরের ফসল বাঁচবে আর হাওরের এক ফসল মানে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় চোখ-বন্ধ করা স্বস্তি, বৈদেশিক মুদ্রার অতুলনীয় সাশ্রয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতি।
শশাঙ্ক সাদী: উন্নয়ন ও সমাজ বিশ্লেষক এবং আইজেনহাওয়ার ফেলো
