ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিউবার নিরন্তর লড়াই

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিউবার নিরন্তর লড়াই
×

আখতার সোবহান মাসরুর

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৭:৪৬

কিউবার ইতিহাস কেবল একটি দ্বীপ রাষ্ট্রের ইতিহাস নয়, উপনিবেশবাদ, দাসপ্রথা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের আছে অসাধারণ ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় নিরন্তর মার্কিন চরম শত্রুতার মধ্যেও ৬৭ বছর ধরে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে টিকে আছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র এখন কিউবার ওপর কঠিন জ্বালানি অবরোধ আরোপ করেছে। পনেরো শতকে স্প্যানিশ উপনিবেশ থেকে শুরু করে ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লব ও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক অবরোধ– সব মিলিয়ে কিউবা বিশ্ব রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধের অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগমনের পরে কিউবা স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হয়। প্রায় চার শতাব্দী চলে তাদের শাসন শোষণ। স্পেনীয়রা স্থানীয় টাইনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস, ভূমি দখল, সম্পদ লুণ্ঠন এবং আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের দাস হিসেবে আমদানি করে। ১৮৬৮ সালে দাস প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দিয়ে কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও স্বাধীনতার দাবাগ্নি ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর হোসে মার্তি কিউবার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৮৯৫ সালে স্প্যানিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। মার্তি বলেন, ‘হয় চিরদিন স্বাধীন, নয়তো স্বাধীন হওয়ার জন্য চিরন্তন সংগ্রাম’। ১৮৯৫ সালে চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ১৮৯৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে স্পেন পরাজিত হয়। ফলে স্পেনের শাসন শেষ হলেও কিউবা পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি। ১৯০১ সালের কিউবার সংবিধানে প্লাট এমেন্ডমেন্ট অন্তর্ভুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার করে দেয়। কিউবা স্পেনের উপনিবেশ থেকে মার্কিনের নয়া উপনিবেশে পরিণত হয়।

ফালজেনসিও বাতিস্তার শাসনে কিউবায় মার্কিন আধিপত্য বাড়ে।  এ সময়ে দুর্নীতি, বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালের বিপ্লব সফল হলে সামন্ত জমিদারদের কাছ থেকে জমি নিয়ে দুই লাখ কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মার্কিন চিনি কোম্পানির কাছ থেকে ৭০ হাজার একর জমি উদ্ধার করা হয়। শিল্প জাতীয়করণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বৈষম্য কমানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। কিউবাকে রুখতে মার্কিন বিমান হামলা, অন্তর্ঘাত ও ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার অসংখ্য চেষ্টা করা হয়। আত্মরক্ষায় কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়। 

১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা শুরু করে। ১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবার বিরুদ্ধে পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা দেন, যাতে বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও ভ্রমণ সীমিত করা হয় হয়। এই অবরোধ শীতল যুদ্ধের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। কিউবার দ্বীপ বে অব পিগসে মার্কিন আক্রমণ (১৯৬১) ও কিউবার মিসাইল সংকট (১৯৬২) যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ককে চরম শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং অবরোধ আরও কঠোর হয়।
১৯৫৯ সালের বামপন্থি বিপ্লবের পর থেকে কিউবা ধারাবাহিকভাবে মার্কিন দুর্বাসনা ও অবরোধের আওতায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগ হ্রাস, ঔষধ ও প্রযুক্তি আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট ও  জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে। 
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বছরের ৮ মে মাসে কিউবার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা থেকে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর কিউবা গুরুতর জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। মার্কিন সরকার কিউবা দখলে নেওয়ারও হুমকি দিচ্ছে। দেশটি ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত। 

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবরোধকে সৌরশক্তি দিয়ে মোকাবিলার কৌশল গ্রহণ করেছে কিউবা। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে তেল আমদানি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষত সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা। চীনের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এসব প্রকল্প। কিউবা ২০২৮ সালের মধ্যে ৯২টি সৌরপার্ক চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে ৫৫টি তৈরির কাজ শেষ হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ দাঁড়াবে ২৪ শতাংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনা আছে।  

কিউবার ক্ষেত্রে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে। যা দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে মার্কিন হুমকি ও অবরোধ মোকাবিলায় আরও সক্ষমতা অর্জন করবে। ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ‘আমেরিকা মহাদেশ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ’– এই নীতি অনুসরণে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নতুন থাবা সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের বিগ স্টিক পলিসি ‘নরমভাবে কথা বলো, কিন্তু হাতে বড় লাঠি রাখো’– সামরিক হুমকি ও আধিপত্যবাদী পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত আছে। এসব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির লক্ষণ নয়; বরং ক্ষয়িষ্ণু আধিপত্য ধরে রাখার জবরদস্তিমূলক চেষ্টারই অংশ। সাম্রাজ্যবাদের চাপ মোকাবিলায় কিউবার কাছ থেকে আমাদেরও শেখার আছে।

ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×