ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

নিরাপদ কোরবানির গরু নিশ্চিতে প্রশাসনিক কর্তব্য

নিরাপদ কোরবানির গরু নিশ্চিতে প্রশাসনিক কর্তব্য
×

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:৩২

পশু কোরবানি ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত ইবাদত। কিন্তু গরু মোটাতাজা করে অতি মুনাফার নেশা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিমভাবে পুষ্ট গরু আর প্রাকৃতিক খাবারে পুষ্ট গরুর পার্থক্য নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন। বিক্রীত গরুর কোনো ‘ওয়ারেন্টি’ নেই বিধায় রোগাক্রান্ত কিংবা কৃত্রিমভাবে পুষ্ট গরুর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অবকাশ নেই। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৮৮ সালে স্টেরয়েডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। গ্রোথ হরমোন হিসেবে স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক খামারি সতর্ক ও সচেতন নয়। এর মাত্রাধিক প্রয়োগে গরুর অকালমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি অতিরিক্ত ইউরিয়া খাইয়ে গরুকে রাতারাতি মোটাতাজা করা হয়। যদিও ইউরিয়া নাইট্রোজেনের শক্তিশালী উৎস, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন গরু ও মানুষ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। স্টেরয়েডের প্রতিক্রিয়ায় গরুর পরিপাকতন্ত্র ‘হাইপার অ্যাকটিভ’ হয়ে যায়। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষুধা ও পিপাসায় অতিরিক্ত মাত্রায় খাদ্য গ্রহণের প্রভাবে পরিপাকতন্ত্রে পড়ে অসহনীয় চাপ। পরিপাকতন্ত্র অতিরিক্ত খাদ্য হজমে ব্যর্থ হওয়ায় শরীরে অতিরিক্ত সঞ্চিত খাবার কিডনিতে সৃষ্টি করে বাড়তি চাপ। শরীরে অতিরিক্ত পানি ও মূত্র অনিষ্কাশিত থাকায় গরুর শরীর ফুলে যায়। কোরবানির ঈদের তিন থেকে ছয় মাস আগে গরু কিনে খামার ও বাড়িতে চলে এ মেকানিজম। 

এ ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তার শতভাগ অনুশাসন কঠিন। এমনকি গবাদি পশুর প্রতিষেধক মেয়াদোত্তীর্ণ বা যথাযথভাবে সংরক্ষিত কিনা, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। কোনটি অপরাধ, কোনটি অপরাধ নয়, তা অনুধাবনে খামারিদের যুগপৎ প্রশিক্ষণ ও আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য।

পশুতে বিষক্রিয়া ফুড চেইনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে কিডনি, লিভার, হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এমনকি গর্ভবতীর হরমোন ভারসাম্যও নষ্ট হয়। 
খাদ্য নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট এ অপরাধ দমনে প্রয়োজন আইনের কঠোর অনুশাসন এবং ক্রেতাসাধারণের সচেতনতা। এ অপরাধ বন্ধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মোবাইল কোর্টের অভিযান অপরিহার্য। মোবাইল কোর্ট ভেজাল সংক্রান্ত অপরাধ দমন এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে সফলতা এনেছিল। ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইনের ১০২ নম্বর তপশিলে ‘মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ আইনের ১২(১)(ক) ধারামতে, মৎস্য বা পশুখাদ্যে মানুষ, পশু, মৎস্য বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ থাকলে এবং একই আইনের ১২(১)(খ) ধারা অনুযায়ী ওই খাদ্যমান আদর্শমানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য। এ ছাড়া একই আইনের ১৪(১) ধারার মৎস্য ও পশুখাদ্য হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড, কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ। এসব অপরাধ মোবাইল কোর্টে অবশ্যই বিচার্য। সুতরাং গরুতে বিষাক্ত পদার্থ বা ওষুধের উপস্থিতি প্রমাণিত হলে মোবাইল কোর্টের আওতায় তাৎক্ষণিক জেল-জরিমানা প্রয়োগ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিকর এসব গরু ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮)-এর ৫১৬এ থেকে ৫২৫ ধারার আলোকে জব্দ করে ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী জবাই করে মৃত গরুটি নির্দিষ্ট বর্জ্যাগারে বা জনবসতি থেকে দূরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। পশুর হাটে আনা কোরবানির গরু প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে দৈব চয়নের ভিত্তিতে গরুর রক্তের পরীক্ষা করতে হবে। নতুবা এ আইন প্রয়োগের সার্থকতা থাকবে না। মানুষকে বোঝাতে হবে– কোরবানির সার্থকতা শুধু মোটা বা তাজা গরু নয়, বরং ধর্মীয় বিধান হলো নিখুঁত ও স্বাস্থ্যবান গরু কেনা।

অতি মুনাফার লোভে বিষাক্ত খাদ্য ও ওষুধে লালিত পশু ধ্বংস করা হলে ভবিষ্যতে তা নিঃসন্দেহে অপরাধ বন্ধের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। যুক্তরাজ্যে ১৯৮৮ সালে ‘ম্যাডকাউ’ ডিজিজ উদ্ঘাটিত হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক গরু ধ্বংস করে ফেলা হয়। অথচ বাংলাদেশে রোগাক্রান্ত গরু জবাই করে সুস্থ গরু দেখিয়ে বাজারে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে।

সুতরাং এ মানবস্বাস্থ্য বিধ্বংসী অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধীর জেল-জরিমানা ও অসুস্থ পশু ধ্বংসের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। যে কোনো অপরাধ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক উদ্ঘাটন ও বিচার যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োগ। এ ছাড়া গবাদি পশু, মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবারের আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হলে ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গরুর জেনেটিক গুণাবলি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সুতরাং জেনেটিক্যালি গরুকে উন্নত করতে হবে এবং গোখাদ্যের উৎপাদন ও মান বাড়াতে হবে। বিদেশ থেকে উৎকৃষ্ট মানের সিমেন আমদানি নিশ্চিত করতে হবে।

কয়েক দিন পর ঈদুল আজহা। অনতিবিলম্বে জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কারিগরি জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা নিয়ে মোবাইল কোর্ট মাঠে নামাতে হবে।

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী: সাবেক অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×