ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ধর্ষণ রোধে রাষ্ট্রের দায় এবং সামাজিক প্রতিরোধ

ধর্ষণ রোধে রাষ্ট্রের দায় এবং সামাজিক প্রতিরোধ
×

ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা শুধু আইনি নয়, এটি নৈতিক ও সামাজিক

হাফিজুর রহমান

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১৭:০৯ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১৭:১০

পত্রিকার পাতা উল্টালেই যে নামটি আজ বুক কাঁপিয়ে দেয়, কাল তা স্রেফ একটি তুচ্ছ সংখ্যায় পরিণত হয়। বাংলাদেশে ধর্ষণ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি এক ভয়াবহ সামাজিক মহামারি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল। আছিয়া, তনু, নুসরাত থেকে শুরু করে আজকের রামিসা—এই নামগুলো আমাদের যৌথ বিবেকের ওপর এক একটি দগদগে ক্ষত হয়ে রাজত্ব করে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা চিরাচরিত নিয়মে শোক করি, ক্ষোভে ফুঁসে উঠি একসময় ভুলে যাওয়ার এক আত্মঘাতী সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দিই। কিন্তু ধর্ষকেরা থামে না। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে, এই রাষ্ট্রে ভুক্তভোগীর কপালে জোটে নীরব কান্না আর ধর্ষকের চারপাশে থাকে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা।

আন্তর্জাতিক অপরাধমনোবিজ্ঞান বলে—ধর্ষণ কখনো কোনো জৈবিক কামনা বা যৌনতানির্ভর অপরাধ নয়; এটি মূলত সহিংসতার প্রকাশ, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের এক বিকৃত মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ধর্ষক মূলত ভোগ করতে চায় অন্যকে অবদমিত করার, অপমান করার এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার এক পৈশাচিক অনুভূতি। সমাজ যখন প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে, পরিবার যখন ছেলেদের "পুরুষ" হওয়ার নামে উগ্র আগ্রাসন শেখায়, আর রাজনৈতিক দলগুলো যখন অবলীলায় ধর্ষকদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন ধর্ষকের অবচেতন মন বুঝে যায়—এই সমাজ ও রাষ্ট্র আসলে তার পক্ষে।

সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ’র কথাই ধরা যাক। এগারো জন নারীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা এই সাইকোপ্যাথের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, এগুলো কোনো তাৎক্ষণিক ভুল নয়, বরং এটি এক ধরনের নিয়ত অভ্যাসে পরিণত হওয়া বিকৃত মনস্তত্ত্বের ফল। এমন অপরাধীরা মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিহীনতার অবিকল্প স্বাদ থেকে অপরাধ করার চরম সাহস পায়। সে বছরের পর বছর ধরে নারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে এই পৈশাচিক উৎসব চালিয়ে গেছে, কারণ আইন তাকে বিন্দুমাত্র ভয় দেখাতে পারেনি। বিচারব্যবস্থা তাকে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোনো বার্তা দিতে পারেনি। সামাজিক মনস্তত্ত্বে একেই বলা হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি—যেখানে অপরাধ অদৃশ্য এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা পেয়ে যায় এবং অপরাধীর মনে জন্ম নেয় এক বিকৃত আত্মবিশ্বাস: "আমি যা-ই করি না কেন, আমি ধরা পড়ব না।"

পোশাকের খোঁড়া যুক্তি: ধর্ষণ সংস্কৃতির অন্তরায়
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশে ভুক্তভোগীর পোশাক, আচরণ বা চলাফেরার সময় নিয়ে কাঁদা-ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। "পোশাকের অশালীনতাই অপরাধের মূল কারণ"—এই ধরনের সামাজিক প্রচার বা বয়ান কেবল অপরাধের মূল কারণকে আড়াল করে না, বরং পরোক্ষভাবে অপরাধীকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ছাড় দেয়। অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পোশাকের সাথে ধর্ষণের কোনো প্রত্যক্ষ বা যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।

যদি পোশাকই অপরাধের মূল অনুঘটক হতো, তবে আট বছরের শিশু আছিয়া কিংবা শিশু রামিসার ক্ষেত্রে কোন যুক্তি প্রযোজ্য হয়? শৈশবের নিস্পাপ গণ্ডি পার না হওয়া এই শিশুরা তো কোনো তথাকথিত 'উস্কানিমূলক' পোশাক পরেনি। শুধু কন্যাশিশু নয়, এই অপরাধের শিকার হচ্ছে ছেলেশিশুরাও। বনশ্রীর মাদ্রাসায় বলাৎকারের শিকার হয়ে ক্ষোভে ও অপমানে আত্মাহুতি দেওয়া শিশু আবদুল্লাহর পোশাক কীভাবে একজন অপরাধীকে উৎসাহিত করতে পারে?

বাস্তবতা হলো, চার দেয়ালের অভ্যন্তরে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনে মোড়ানো বোরকা কিংবা হিজাব পরিহিত নারী ও শিশুরাও এই পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নিজ ঘরে, চেনা ও নিরাপদ পরিবেশে পরম আত্মীয় বা পরিচিত মানুষের হাতেই অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। স্কুলগামী কিশোরী থেকে শুরু করে গৃহকোণে থাকা সাধারণ গৃহবধূ—কেউই এই বিকৃত মানসিকতার বাইরে সুরক্ষিত নন।

আসলে সত্য এই যে, ধর্ষকের সমস্যা নারীর পোশাকে নয়; তার সমস্যা তার পশুসুলভ ক্ষমতালিপ্সায় ও সামাজিক নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের। ধর্ষণের দায় পোশাকের ওপর চাপানো কোনো যুক্তি নয়, এটি স্রেফ ধর্ষককে আড়াল করার কাপুরুষোচিত অপচেষ্টা। আর যারা এই দোহাই দিয়ে ধর্ষকের পক্ষে সাফাই গায়, তারা আসলে সভ্য সমাজের কেউ নয়—তারা হলো এই "ধর্ষণ সংস্কৃতির প্রকাশ্য উৎসাহদাতা"।

বিচারহীনতার গোলকধাঁধা, অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও আইনি স্বেচ্ছাচারিতা

বিলম্বিত বিচার মানেই বিচারকে অস্বীকার করা—উক্তিটি কেবল কোনো আইনি বুলি নয়, এক নির্মম বাস্তবতা। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হলেও মামলার জট, তদন্তের গাফিলতি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে চরম দুর্বলতার কারণে ন্যায়বিচার স্রেফ অলীক কল্পনা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজা হওয়ার হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। এর অর্থ দাঁড়ায়, ৯৬ শতাংশ অপরাধীই কোনো না কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে! এই বিপুল মামলার একটি বড় অংশ বিচারাধীন অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকে। 
এই বিচারহীনতা শুধু আইনি দুর্বলতা নয়, এটি অপরাধীর জন্য এক রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা। এর পেছনে কাজ করে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব। স্বেচ্ছাচারী তদন্ত ও আলামত নষ্ট করার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে হয় তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে। অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও ক্ষমতার প্রভাব থাকে কমবেশি প্রতিটি ঘটনায়। শাস্তি বাস্তবায়নের থমকে থাকার উদাহরণ অনেক। তবুও যদি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা দিয়ে উদাহরণ দিতে চাই তবে রসু খাঁ’র মতো জঘন্য সিরিয়াল কিলারের চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর হতে দশকের পর দশক লেগে যাওয়াই যথেষ্ট। এই কচ্ছপ গতির বিচার প্রক্রিয়া ধর্ষকদের মনে এই বার্তা দেয়—"অপরাধ করলেও এ দেশে বেঁচে থাকার ও পার পাওয়ার হাজারটা গলি খোলা আছে।"

যখন একজন ধর্ষক জানে যে তার রাজনৈতিক পরিচয়, টাকা কিংবা সাক্ষীকে ভয় দেখানো—এই সবকিছু তাকে বাঁচিয়ে দেবে, তখন সে আরও বেশি নির্মম হয়ে ওঠে। এই সমাজে ধর্ষক একা জন্মায় না। তাকে সম্মিলিতভাবে তৈরি করে আমাদের পরিবার, বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষা, ক্ষমতালোভী রাজনীতি, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং আমাদের এই মেরুদণ্ডহীন নীরব দর্শক সমাজ। প্রতিটি "মেয়েরা সাবধানে চলাফেরা করুক" ধরনের উপদেশ আসলে ধর্ষকের শক্তির কাছে এক ধরনের কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—"পুরুষরা কেন ধর্ষণ করে?" কিন্তু এই পচা সমাজ আজও উল্টো প্রশ্ন তোলে—"মেয়েটা কোথায় ছিল?"

তনুর গায়ের রক্ত বহু আগেই শুকিয়ে গেছে, নুসরাতের শরীরের আগুন নিভে গেছে, শিশু আছিয়ার আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে গেছে, আর রামিসার নিথর দেহটা আজ মাটির নিচে অন্ধকার কবরে ঘুমাচ্ছে—কিন্তু আমরা কি একটুও বদলেছি? আছিয়া, তনু, রামিসা—তারা শুধু পত্রিকার পাতা বা টেবিলের কোনো শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়; তারা আমাদের সমাজের হারিয়ে যাওয়া মানবিকতার এক একটি রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই এই লজ্জাজনক দায় থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় কঠোর জবাবদিহিতা ও সংস্কার আনতে হবে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে লিঙ্গসমতা ও জেন্ডার সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সবশেষে একটাই কথা—ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা শুধু কোনো আইনি লড়াই নয়, এটি আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত যুদ্ধ। 

হাফিজুর রহমান: মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন

×