সমকালীন প্রসঙ্গ
রাষ্ট্রের মর্যাদা, সীমান্তে দৃঢ়তা এবং বিজিবির অবস্থান
ফাইল ছবি
জামান সরদার
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ২১:০৮
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত শুধু ভৌগোলিক রেখা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। সীমান্তে প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি অবস্থান এবং প্রতিটি প্রতিরোধ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গেই সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের তিনবিঘা করিডোর এলাকায় যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি আবারও প্রমাণ করেছে- সীমান্ত প্রশ্নে দুর্বলতা দেখানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এই ঘটনা দেখিয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং কৌশলগতভাবে সচেতন অবস্থানে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি জমি মাপজোখ ও বাঁশের খুঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। বিজিবি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানায় এবং স্পষ্ট করে বলে যে, ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা বা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা যাবে না। এটি কোনো নতুন দাবি নয়; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ।
বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পরিষ্কার এবং আইনি ভিত্তিসম্পন্ন। কিন্তু এই আপত্তির পর সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের বৈঠকে বিএসএফ অভিযোগ তোলে যে, বিজিবি ‘ফায়ারিং পজিশনে’ গিয়েছিল। জবাবে বিজিবি যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেটিই পুরো ঘটনার মূল বার্তা বহন করে। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত চুক্তি লঙ্ঘনের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় তারা আত্মরক্ষামূলক ও প্রতিরোধমূলক অবস্থান নিয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। ‘ফায়ারিং পজিশনে যাওয়া’ মানেই যুদ্ধ উসকে দেওয়া নয়। বরং সীমান্তে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কিংবা কৌশলগত চাপ মোকাবিলায় প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া নিয়মতান্ত্রিক সামরিক কৌশল। কোনো রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যদি নিজের অবস্থান রক্ষা করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সেই সীমান্ত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় ধরেই বাংলাদেশের সীমান্তে একটি মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা কাজ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় বাহিনীর একতরফা কার্যক্রমের সামনে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। এবার বিজিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে- আন্তর্জাতিক চুক্তির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ হলে বাংলাদেশ তা মেনে নেবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তেজনার পর বিএসএফ কয়েকটি স্থানে স্থাপন করা বাঁশের খুঁটি সরিয়ে নিয়েছে এবং সীমান্তে কোনো বেসামরিক লোকজনও আনেনি। এটিকে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের প্রতি একটি বাস্তব প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সীমান্তে শক্ত অবস্থান অনেক সময় সংঘাত কমায়, কারণ এতে উভয় পক্ষই বুঝতে পারে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া হবে না।
ভারতে বর্তমানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি অনেক বেশি প্রভাবশালী। সীমান্ত ইস্যুকে প্রায়ই রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের কোনো পদক্ষেপও অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকেত বহন করে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো- আবেগ নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও কৌশলগত বাস্তবতার ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখা।
তিনবিঘা করিডোরের ইতিহাসও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বহু বছর ধরে এই এলাকা দুই দেশের মধ্যে জটিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং পরবর্তী সমঝোতাগুলো সীমান্তে স্থিতিশীলতা আনার জন্যই করা হয়েছিল। সেই বাস্তবতায় নতুন করে শূন্যরেখার কাছাকাছি স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সীমান্তে আইনভিত্তিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। কূটনৈতিক যোগাযোগ, সীমান্ত বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দিতে হবে। কারণ সীমান্তে যারা দাঁড়িয়ে থাকে, তারা কেবল একটি বাহিনীর সদস্য নয়; তারা রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা।
বিজিবির সাম্প্রতিক অবস্থান সীমান্তবাসীর মাঝেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তাদের নিরাপত্তাবোধ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের সঙ্গেই যুক্ত। ফলে সীমান্তে দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাস জনগণের মনস্তাত্ত্বিক শক্তিও বাড়ায়।
তবে একই সঙ্গে সংযমও অত্যন্ত জরুরি। সীমান্তে উত্তেজনা কখনোই পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নেওয়া উচিত নয়। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক- বাণিজ্য, যোগাযোগ, নদী, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই সম্পর্ক জড়িত। তাই কৌশল হওয়া উচিত ‘দৃঢ়তা, কিন্তু উসকানি নয়’।
বিজিবি যে বার্তা দিয়েছে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা হলে আবারও প্রতিরোধমূলক অবস্থান নেওয়া হবে- সেটি মূলত সীমান্ত চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ঘোষণা। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত নীতির প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি।
রাষ্ট্রের মর্যাদা অনেক সময় যুদ্ধ দিয়ে নয়, বরং দৃঢ় অবস্থান ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে রক্ষা করা হয়। সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সদস্য যখন জানেন যে তিনি দেশের আইন, চুক্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, তখন সেই অবস্থানই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।
আজকের বিশ্বে সীমান্ত শুধু ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি কৌশল, মনস্তত্ত্ব এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ কিন্তু অনড় অবস্থান। আর সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়েছে, প্রয়োজন হলে বিজিবি সেই অবস্থান নিতেও প্রস্তুত।
জামান সরদার: বিশ্লেষক
