সমকালীন প্রসঙ্গ
হাম প্রমাণ করেছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ‘ইন ডেঞ্জার’
চিকিৎসকদের কাছ থেকে রোগীরা একটু ইতিবাচক এবং প্রেরণাদায়ক ব্যবহার আশা করে থাকেন।
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৮:০০
প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ রেখেই ডাক্তার সাহেব বলে উঠলেন– ‘ইউ আর ইন ডেঞ্জার’। কোনো ডাক্তার যখন রোগীকে বলেন ‘ডেঞ্জারে’র কথা, তখন বুঝে নিতে হবে রোগী ভীষণ বিপদে। তিনি জানালেন, হার্টের অবস্থা খুবই খারাপ; কমপক্ষে তিনটি ব্লক আছে এবং সময় বেশি নেই।
দুর্বল চিত্তের কোনো মানুষ চিকিৎসকের মুখ থেকে এ ধরনের ‘চূড়ান্ত নেতিবাচক বাক্য’ শুনে ‘হার্ট’ (কার্ডিয়াক) অ্যাটাকের শিকার হতে পারেন। বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল; বিশেষত আমাদের দেশে। কেননা রোগীরা ডাক্তারের মুখে ইতিবাচক কথা শুনেই অর্ধেক শক্তি ফিরে পান।
যা-ই হোক, উপায়ান্তর না দেখে জিজ্ঞেস করি– হার্টে ব্লক আছে, এমন কথা কি রিপোর্টে সরাসরি লেখা আছে? এনজিওগ্রাম না করে কি বোঝা সম্ভব? ডাক্তার উত্তর দিলেন– ‘সরাসরি লেখার প্রয়োজন নাই; আমরা রোগীর মুখ দেখেই বুঝতে পারি। একজন ডাক্তার হিসেবে যা বলার সেটা বলেছি; বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত।’ বলে রাখি এই সঙ্গে তখনই জানিয়ে দিলেন– তিনটি রিংয়ের দামসহ অস্ত্রোপচারে মোট সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করলেন, সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে রিং পরাতে হবে।
ওপরে বর্ণিত কাহিনি চিত্রনাট্য নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটনাটি আমার সঙ্গে ঘটেছে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। গিয়েছিলাম উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা নিয়ে। ফিরেছিলাম এই ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে একটা ভাবনা আমার মাথায় ছিল, হার্টে ব্লক থাকলে তো বুকে ব্যথা থাকার কথা।
এর দু-একদিন পর আরেকজনের পরামর্শে গেলাম আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সরকারি ‘ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউটে’। রোগের বর্ণনা শুনে তারা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। পরের দিন আমার এনজিওগ্রাম হয়। প্রথমেই ডান হাতের কব্জির শিরায় চিকন একটি ক্যামেরা (নাকি অন্যকিছু) ঢুকিয়ে দিলেন একজন চিকিৎসক। কনুই বরাবর হাতের শিরায় সামান্য একটু অস্তিত্ব অনুভব করেছিলাম। এরপর অন্য কোথাও আর কোনো কিছুর চলাচল অনুভব করিনি পুরো সময়।
যে অপারেশন থিয়েটারে আমার এনজিওগ্রাম হচ্ছিল, সেখানে প্রায় সাত-আটজন ডাক্তার-নার্সের সম্মিলিত একটি টিমকে দেখেছি পেশাদারিত্বের সঙ্গে তৎপর হতে। তিন দিকে বড় বড় সব মনিটর। মাঝখানে একটি ক্রেন। ক্রেনের মাথায় একটি ক্যামেরা। আমার বুকের ওপরে উজ্জ্বল চক্রাকার লাইট-গুচ্ছ (সিনেমায় যেমন দেখা যায়) জ্বালিয়ে তারা আমার হার্টে ব্লক খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন (ভেতরে বাইরে) যন্ত্রপাতি দিয়ে।
হার্টের বাইরের ক্যামেরাটি কখনও আমার বুকের খুব কাছাকাছি, কখনও পেটের উপরিভাগে, আবার কখনও বা আমার গলা কিংবা মুখের খুব কাছাকাছি ঘুরছিল। অপারেশন টিমের প্রধান ডাক্তার মাঝেমধ্যে চলচ্চিত্র পরিচালকের মতো ক্যামেরা (হার্টের ভেতর এবং বাইরের) মুভমেন্টের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন সহকারীদের।
প্রায় মিনিট দশেক অভিযান চালানোর পর ডাক্তার একটু হতাশার ভঙ্গি করে বললেন– কিছুই পাওয়া গেল না। আপনার হার্টে কোনো ব্লক নেই। অপারেটরকে নির্দেশ দিলেন মনিটরটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিতে। বললেন– আপনার হার্টের শিরাগুলো বেশ মোটা। সে জন্য কোনো ‘সেডিমেন্ট’ জমতে পারেনি ওখানে। যৎসামান্য যা জমেছিল, সেগুলো আমরা ‘ড্রেজিং’ করে পরিষ্কার করে দিয়েছি। এবার উঠুন, লাঞ্চ সেরে আপনার শুটিংয়ে চলে যান বলেই হাসতে থাকেন চিকিৎসক।
পাঠকের জন্য এত দীর্ঘ সময় নিয়ে বেসরকারি হাসাপাতাল আর সরকারি হাসপাতালের ভিন্ন ভিন্ন সেবার কথা উল্লেখ করলাম। আমার আগ্রহ আচরণগত পার্থক্যটি স্পষ্ট করা।
তবে সবক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটছে এমন কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। সে রকম বলাটা অযৌক্তিক, অনৈতিক। কিন্তু চিকিৎসকদের কাছ থেকে রোগীরা একটু ইতিবাচক এবং প্রেরণাদায়ক ব্যবহারই তো আশা করে থাকেন। চিকিৎসকের ওইটুকু আন্তরিকতার ছোঁয়ায় রোগীরা তো ডাক্তারের চেম্বারেই সুস্থ হয়ে যান অর্ধেকটাই। এরপর বাড়িতে ফেরেন পূর্ণ শক্তি নিয়ে।
পাঠক বিশ্বাস করুন, রাজধানীর ওই বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের দেওয়া ‘সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার’ বাজেটের বিপরীতে ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউটে দুদিন এনজিওগ্রামসহ সব খরচ মিলে আমার ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৪০০ টাকা। আর নিজের শরীরের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
এখানে জরুরি একটি তথ্য আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি, যদি আমাকে কেউ শেখ হাসিনার মুৎসুদ্দি না ভাবেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা নাকি ‘তাঁর দপ্তর’ থেকে এই ইনস্টিটিউটে প্রতিবছর ৫০০টি ‘রিং’ (স্টেন্ট) দিয়ে রাখতেন গরিব, আর্থিকভাবে অসমর্থ রোগীদের জন্য। সম্পূর্ণ বিনা খরচে এই স্টেন্টগুলো তাদের হার্টে লাগিয়ে দেওয়া হতো। সর্বোপরি অপারেশন থিয়েটারে রোগীর একজন ‘স্বজনে’র উপস্থিতিতেই স্টেন্ট পরানোর নিয়ম বাধ্যতামূলক করেছিলেন তিনি। কারণ অনেক সময় ‘স্টেন্ট’ না পরিয়েই নাকি স্টেন্টের দাম নিয়ে নেওয়ার কিছু অসাধুতার অভিযোগ উঠেছিল।
চিকিৎসার শুরুতে আমার আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা জেনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই ‘তহবিল’ থেকে একটি স্টেন্ট ‘অফার’ (বিনে খরচায়) করেছিলেন আমাকে। সানন্দে রাজি হয়েছিলাম নিতে। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় স্টেন্টের আর প্রয়োজন হয়নি।
তবে বলে রাখা ভালো, প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর সঙ্গে তুল্যমূল্যে সরকারি হাসপাতালগুলো নিশ্চয়ই ‘স্বর্গ’ নয়। সরকারি হাসপাতালে দালালের উৎপাত, স্বজনপ্রীতিসহ আরও অনেক অভিযোগ আছে। সেসব অভিযোগের তালিকাও নেহাত স্বল্প দৈর্ঘ্যের নয়। কিন্তু তারপরও একজন রোগী আর্থিকভাবে নিঃস্ব হওয়ার আগেই অন্তত সরকারি হাসপাতালের বিল চুকিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে একজন মধ্যবিত্ত রোগীকে ‘রিলিজ’ নেওয়ার সময় সব দিয়ে-থুয়ে ‘রিক্তহস্তে’ ঘরে ফিরতে হয় (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই)। প্রাইভেট হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে রোগীকে কদাচিৎ ‘মরিয়া প্রমাণ করিতে’ হয়– চিকিৎসার হাত হইতে তিনি বাঁচিয়া গিয়াছেন! চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই ‘ফিচার’ আমাদের নিত্তনৈমিত্তিক! উল্লিখিত দুই পদের চিকিৎসা-সমস্যা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। তবে ফলাফল ওই পর্যন্তই। পরিবর্তন খুব একটা আসেনি।
তবে ঘটনাগুলো বেশি করে মনে পড়ল আমাদের সাম্প্রতিক ‘হাম সমস্যা’র সূত্র ধরে। গত ১৯ মে (২০২৪) তারিখে ‘সমকাল’-এর একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল– ‘প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যেও হাম ছড়াচ্ছে’। ২৪ মে (২০২৪) তারিখের ‘প্রথম আলো’য় শিরোনাম ছিল– ‘হামে শিশুমৃত্যু ৫০০ ছাড়াল’। ২৫ মে পুনরায় ‘সমকাল’-এর শিরোনাম– ‘হাম পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে’। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। তখনই আলোচনা শুরু হয়েছে, ঈদের ছুটিতে ‘হাম’-এর প্রকোপ আরও বিস্তৃত হতে পারে। ঈদের ছুটি শেষ হচ্ছে ৩১ মে। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, বিষয়টি যতখানি উদ্বেগজনক সে অনুপাতে আমাদের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের মধ্যে এটা নিয়ে ভাবনার কোনো লক্ষণ কিন্তু দেখা যায় না। তাহলে অবহেলাটা কি ‘শিশু-মৃত্যু’ বলেই? ‘প্রাপ্ত বয়স্ক’দের বেলাতেও একই মাত্রায় সংক্রমণ এবং মৃত্যু (পাঁচ শতাধিক) হলেই কি তবে আমাদের টনক নড়বে?
গোদের ওপর বিষফোড়া, হামের টিকা এবং শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সব ব্যর্থতা, অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার দায় কিন্তু এসে পড়েছে তিন মাস বয়সী বর্তমান সরকারের কাঁধে। অথচ হামের প্রকোপের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী না হয়েও হামের চিকিৎসার দায় নিতে হচ্ছে তাদের কাঁধেই। কদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে ‘ইউনিসেফ’-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘বর্ণনা’ শুনে তো মনে হয় না, বর্তমান সরকার তাদের সবকিছু উজাড় করে দিলেও এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।
পরিশেষে বলতে হয়, রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালের সেই ডাক্তারের কথাটিই যেন ফলতে যাচ্ছে। তিনি রোগীকে বলেছিলেন, ‘ইউ আর ইন ডেঞ্জার’। ‘ইউ’-এর স্থলে ‘উই’ শব্দটি বসিয়ে দিলেই বর্ণনা হয়ে যায় দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা খাতের পরিস্থিতি।
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা
