ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

তালেবান-রাশিয়া সমঝোতা আফগানিস্তানের জন্য কী বার্তা দেয় 

তালেবান-রাশিয়া সমঝোতা আফগানিস্তানের জন্য কী বার্তা দেয় 
×

২৭ মে তালেবান ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় নিরাপত্তা সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক

শাহমাহমুদ মিয়াখেল

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ১৮:৪৯

২৭ মে তালেবান ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যদিও এর বিষয়বস্তু এখনও অপ্রকাশিত রয়েছে। এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থানের ব্যাপারে স্মারকটির প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। 

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অভ্যন্তরীণ বৈধতা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিবিহীন কোনো সরকারের দ্বারা সম্পাদিত চুক্তিগুলো আইনি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৌশলগত দিক থেকে এই ব্যবস্থা আফগানিস্তানের দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থকে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নাও নিয়ে যেতে পারে। বরং এটি দেশটিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরও জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। যাই হোক, আফগানিস্তানের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থা কিছু বিশেষ সতর্কতা দাবি করে। প্রধান শক্তিগুলো খুব কমই প্রাথমিকভাবে আফগান স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বে যুক্ত হয়; বরং তারা নিজেদের জাতীয় অগ্রাধিকার পূরণের জন্যই এসব করে থাকে।

বর্তমানে রাশিয়া আফগানিস্তানকে সেই মাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক বা রাজনৈতিক সমর্থন দিতে ইচ্ছুক বা সক্ষম বলে মনে হচ্ছে না, যা সাধারণত একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিচায়ক। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রশ্নটি হলো, যদি রাশিয়াকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে কোন কৌশলগত সুযোগ বা হুমকি এই ধরনের সম্পর্ককে চালিত করছে?
রাশিয়া ও তালেবানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা কোনো গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের চেয়ে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারাই বেশি চালিত বলে মনে হচ্ছে।

রাশিয়ার পাশাপাশি অনেকাংশে চীনের জন্যও আফগানিস্তানে প্রধান উদ্বেগ হলো চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখা। এ ছাড়া অঞ্চলজুড়ে মাদক সরবরাহ কমিয়ে আনা। এর বাইরে বর্তমানে কোনো দেশেরই আফগানিস্তানে এমন কোনো বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নেই, যা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিশ্রুতিকে সমর্থন করে।

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর রাশিয়া পরবর্তী আফগান সরকারগুলোকে উল্লেখযোগ্য সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেনি। এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা থেকে বোঝা যায়, মস্কো এখন এমন মাত্রার সহায়তা দিতে প্রস্তুত– যা আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেবে।

অন্যদিকে তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে আফগানিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক আন্তঃসীমান্তে সামরিক ঘটনা এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার খবর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। 

একই সময়ে আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পূর্ববর্তী আফগান সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সামরিক সরঞ্জামের বেশির ভাগই ছিল মার্কিন ও রুশ-নির্মিত ব্যবস্থার মিশ্রণ। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা বা খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে না, তাই মার্কিন নির্মিত সরঞ্জামগুলো হয়তো আর ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। একই সময়ে অবশিষ্ট সোভিয়েত যুগের বা রুশ নির্মিত সরঞ্জামের বেশির ভাগই হয় সেকেলে অথবা আর কার্যকর নয়।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে একটি নিরাপত্তা সমঝোতা স্মারক উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তায় রূপান্তরিত হবে– এমন আশা অবাস্তব প্রমাণিত হতে পারে। বাস্তবিক অর্থে এই চুক্তি সীমিত পরিসরে বাস্তব সুবিধা দিতে পারে, আর একই সঙ্গে আফগানিস্তানের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আরও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

যেসব দেশের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, আফগানিস্তান বাস্তবসম্মতভাবে উভয় পক্ষের সঙ্গে একই রকম কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না। ভারত ও পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইউক্রেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইরানের সঙ্গে একই কৌশলগত বোঝাপড়া অনুসরণ করা আফগানিস্তানের পক্ষে একযোগে সম্ভব– এটি কল্পনা করা কঠিন।

আফগানিস্তান অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে সক্রিয় একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র। সুতরাং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুফলভোগী হওয়ার পরিবর্তে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।


শাহমাহমুদ মিয়াখেল: সুশাসন, প্রতিরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠাবিষয়ক আফগান বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে প্রো-রিপাবলিক ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট অব আফগানিস্তান (পিডিএমএ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
 

আরও পড়ুন

×