দিবস
‘গাড়ি-ঘোড়া’র মনস্তত্ত্ব এবং অবহেলিত সাইকেল
সাইকেল কেবল বাহন নয়, এটি টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং সুস্থ জীবনের প্রতীক
তালুকদার রিফাত পাশা
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ২০:৫৭
আজ ৩ জুন, বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস। দেশে বাইসাইকেল একটি অবহেলিত যাতায়াত মাধ্যম। নানা কারণে বাহনটি মানুষের কাছে অজনপ্রিয়। ২০২৩ সালে ঢাকার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। সে কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়, যার ফল বলছে যে বর্তমানে ঢাকায় মোট যাতায়াতের ২৭ শতাংশ হয় মোটরসাইকেলে, ২২ শতাংশ রিকশা, ভ্যান এবং ঠেলাগাড়ির মতো অযান্ত্রিক যান, ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি, তিন চাকার যান্ত্রিক যান ১৪ শতাংশ মাইক্রো বাস এবং পিকআপের মতো বাহন ৭ শতাংশ, ট্রাক ৬ শতাংশ এবং বাসে যাতায়াত করে ৩ শতাংশ। আর বাইসাইকেলে যাতায়াত হয় মাত্র ১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় যে বাহন হিসেবে বাইসাইকেল আমাদের দেশে কতটা অবহেলিত।
আমাদের দেশে খুব কম সুপরিচিত মানুষ পাওয়া যাবে, যিনি তার দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বাইসাইকেলকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম একজন বাইসাইকেল চালক। এ রকম উদাহরণ আমাদের দেশে খুব কম পাওয়া যাবে। আমাদের সমাজে যখনই মানুষ একটু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে যান তখনই তিনি একটি গাড়ি কিনতে চান এই কারণ দেখিয়ে যে তাঁর নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে।
আমাদের শিশুদের যখন স্কুলে বা বাড়িতে পাঠদান করা হয় তখন আমরা একটি কথা তাদের ঢোকাই– ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চলে সে’। এ রকম একটি কথা যখন শিশুদের মন-মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তখন সে তাঁর চারপাশে তাকায় আর অনেক গাড়ি দেখে ভাবে যে আমিও একদিন লেখাপড়া করে গাড়ি কিনব।
খেয়াল করলে দেখবেন যে বিভিন্ন দিবসে সাইকেল চালানো হয়। আবার সাইকেল নিয়ে ম্যারাথন করে সমুদ্রতটে যাওয়ার মতো উচ্ছ্বাস এবং আগ্রহ দেখা যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং শব্দদূষণ দিবসে অনেক কর্মসূচি আয়োজন করে থাকে, সেসব আয়োজনে দুই চাকার এই বাহনটির কোনো স্থান হয় না। বাইসাইকেল নিয়ে এমন কর্মকাণ্ড মানুষের মাঝে এমন একটি বার্তা দেয় যে বাহনটি দিবস উদযাপন কিংবা তরুণদের অ্যাডভেঞ্চার করার জন্য।
ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে জলাভূমি ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। উড়াল সড়ক এবং ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে যেন মানুষ আরও উৎসাহ পায় গাড়ি কিনতে। একবার ভাবুন তো ঢাকার রাস্তায় মোট যাতায়াতের ২০ শতাংশ যদি সাইকেল হয়, তাহলে আমাদের এই ঢাকার চিত্র কেমন হবে। অন্তত পেট্রল পাম্পগুলোতে আর কখনও সাপের মতো লম্বা লাইন পড়বে না!
সরকার যদি বাইসাইকেলকে যাতায়াতের একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাহলে শুরু করতে হবে সরকারের ভেতর থেকে। সরকারি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা নতুন চাকরিতে যোগদান করছেন, তাদের অনুপ্রাণিত করা যেতে পারে বিনামূল্যে একটি সাইকেল প্রদান করার মাধ্যমে। সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ সব সরকারি অফিসে সাইকেল রাখার স্থান তৈরি করে দিতে হবে যেন মানুষ আগ্রহ পায়। বাইসাইকেল নেটওয়ার্ক ও লেন তৈরির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাইকেল শুধু একটি বাহন নয়, এটি টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং সুস্থ জীবনের প্রতীক। আমাদের সমাজে সাইকেলকে অবহেলার চোখে না দেখে, বরং যাতায়াতের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। যদি আমরা চাই একটি পরিচ্ছন্ন, শব্দদূষণমুক্ত এবং স্বাস্থ্যকর নগরী, তবে সাইকেলকে গুরুত্ব দিতে হবে আজ থেকেই। সরকার, সমাজ এবং ব্যক্তি– সবাই মিলে যদি উদ্যোগ নিই, তবে একদিন বাইসাইকেল হবে আমাদের গর্বের বাহন। সাইকেল দিবস হোক সেই পরিবর্তনের সূচনা, যেখানে প্রতিটি মানুষ গর্ব করে বলতে পারে– ‘আমি সাইকেল চালাই, আমি টেকসই ভবিষ্যতের পথে হাঁটছি।’
তালুকদার রিফাত পাশা: অ্যাডভোকেসি অফিসার ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- সাইকেল
