তৃতীয় মেরু
সীমান্তে ‘পুশইন’ কিংবা আগুন নিয়ে খেলা
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১২:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির দখলের যাওয়ার পর থেকেই সীমান্তের এপাশে ‘পুশইন’ শঙ্কা উচ্চারিত হয়ে আসছিল। ৯ মে মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী ‘অনুপ্রবেশকারী’ আটক করে পুলিশ বা আদালতের বদলে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মে মাসেরই শেষ সপ্তাহ থেকে বিএসএফ নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া শুরু করেছে।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সংগতভাবেই পুশইনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। নজরদারি কাজে যোগ দিয়েছে স্থানীয় জনসাধারণও। সাতক্ষীরা, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, মেহেরপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট প্রভৃতি সীমান্তে অমানবিকভাবে ঠেলে দেওয়া মানুষদের হয় বিএসএফ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, না হয় বিজিবি ‘পুশব্যাক’ করেছে। শনিবার বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন সীমান্তে অবৈধ পুশইনের ৮টি পৃথক চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে (সমকাল, ৬ জুন ২০২৬)।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তা চলছিল। তবে ২০০২-০৩ সালে তুঙ্গে ওঠে এবং এই অমানবিক প্রক্রিয়া ‘পুশইন’ নাম পায়। পুশইনের শিকার মানুষকে ভারতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘পুশব্যাক’। নারী-শিশুসহ শীত-গ্রীষ্ম, রোদ-বৃষ্টিতে শূন্যরেখায় অবস্থানে বাধ্য এসব মানুষের অসহায়ত্ব তখন দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। অ্যামনেস্টিসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিবৃতি দিয়েছিল।
২০০৪ সালে নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে ‘পুশইন’ অবশ্য কমে গিয়েছিল। ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে এনডিএ জোট এবং ২০১৬ সাল থেকে আসামে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও ফের শুরু হয় পুশইন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে ‘পুশইন’ শুরু করেন (দ্য হিন্দু, ২০ আগস্ট ২০২৪)।
গত বছর মে মাসে ‘নতুন মাত্রা’ নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘পুশইন’। ‘সীমান্তে পুশইন: নতুন মাত্রায় পুরোনো করণীয়’ শীর্ষক নিবন্ধে তখন লিখেছিলাম, আগে সাধারণত ভারতের বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে সীমান্তের এপাশে ঠেলে দেওয়া হতো। সেবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মিয়ানমারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী (সমকাল, ১১ মে ২০২৫)।
এমনকি ভারতের গুজরাটে ‘বাংলাদেশি’ আটকের নামে মূলত বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিম ও রোহিঙ্গা মুসলিমদেরও আটক করে সীমান্তে আনা হয়েছিল। খোদ পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছিল এভাবে– ‘বাংলাদেশি সন্দেহে গুজরাত পুলিশের হাতে আটক পশ্চিমবঙ্গের তিন যুবক। তাঁদের দু’জনের বাড়ি বীরভূম এবং একজন পূর্ব বর্ধমানের বাসিন্দা’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ এপ্রিল ২০২৫)।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশের ৩২ জেলার সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। তাদের মধ্যে ১২০ জনই ভারতীয় নাগরিক (প্রথম আলো, ২৯ মার্চ ২০২৬)।
বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করা ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে সীমান্তের দুই পাশের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বেশ শোরগোলও হয়েছিল। এর মধ্যে উড়িষ্যা রাজ্যের হিন্দিভাষী ৭৩ বছর বয়সী শেখ আবদুর জব্বারকে পরিবারের ১৪ জন সদস্যসহ ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাতে কনকনে শীতের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠিয়েছিল বিএসএফ। পরদিন দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে তাদের উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার পর ২৭ ডিসেম্বর ‘পুশব্যাক’ করা হয়।
একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ধীতোরা গ্রামের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিকে স্বামী-সন্তানসহ গত বছর ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠিয়েছিল বিএসএফ। পরে খোদ ভারতীয় আদালতের নির্দেশে সোনালী বিবি ও সন্তানকে ৫ ডিসেম্বর ফেরত নিতে বাধ্য হয় ভারত।
আর আসামের ৭০-ঊর্ধ্ব সাকিনা বিবিকে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা তো বাংলাদেশ-ভারত ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উপজীব্য হয়ে উঠেছে। নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রাম থেকে পুলিশ তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল থানায় ‘একটা সই’ করার জন্য। পরিবার আর তাঁর খোঁজ পায়নি। পরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাঁকে ঘটনাচক্রে খুঁজে পায় ঢাকার এক বস্তিতে (বিবিসি বাংলা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় হলেও সাকিনা বিবি এখনও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ওই ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ভারতেরই সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রোল’ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, এর শিরোনাম– ‘এক আদিবাসী অসমীয় নারীকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছিল, এক বছর পরও তিনি সেখানেই আটকা’ (৪ জুন ২০২৬)।
এক দেশ থেকে ধরে অসহায় মানুষকে আরেক দেশে ঠেলে দেওয়া নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ, দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির লঙ্ঘন। এ ধরনের পদক্ষেপ ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারও পরিপন্থি।

মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তরেখা বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি; ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। শুধু তাই নয়, এই সীমান্ত রেখা প্রাকৃতিকভাবে বিভাজিতও নয়। এমন অনেক জনপদ রয়েছে, যেখানে একই পরিবারের ভিটামাটির মাঝখান দিয়ে সীমান্ত রেখা চলে গেছে। একই ভাইয়ের বাড়ি ভারতে, অপর ভাইয়ের বাড়ি বাংলাদেশে। এ ধরনের সীমান্তরেখার আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কেউ যদি সীমান্ত পার হয়ে যাতায়াত করেও থাকে, তাদের বিনিময় করার জন্য প্রচলিত আইনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে চুক্তিও রয়েছে। তার বদলে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বস্তুত কথিত পুশইনের মধ্য দিয়ে ভারত দ্বিগুণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। একদিকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এসব মানুষের মানবাধিকারের তোয়াক্কা করছে না; অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে গায়ের জোর দেখাচ্ছে। কেউ কেউ যদি সত্যিকার অর্থে বৈধ নথিপত্রহীন হয়েও থাকে; তাদের ‘ডিপোর্ট’ করার সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। তার বদলে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার অর্থ পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধানো।
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশবিরোধী বাগাড়ম্বরে ভেসে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য এতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সীমান্তে ‘পুশইন’ খোদ ভারতের জন্যই আগুন নিয়ে খেলার নামান্তর। কথাটা আমার নয়; ভারতেরই ‘ফ্রন্টলাইন’ ম্যাগাজিনের।
কথিত পুশইনের ঘটনায় ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ১৯৭১ সালের পর রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে’ বলে সতর্ক করে দিয়ে ফ্রন্টলাইন বলেছে– ‘সীমান্ত নিয়ে বাগাড়ম্বর নির্বাচনে জয় এনে দিতে পারে এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের জন্য জনদাবিকে তুষ্ট করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ নিছক প্রতিবেশী নয়। এটা পূর্বদিকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, নদী ব্যবস্থাপনা, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের অভ্যন্তরে হাততালি কুড়ানোর জন্য প্রান্তজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির এই সীমান্তনীতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষার ঝুঁকি তৈরি করে।’
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
