পাবলিক পরীক্ষা
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসসি-এইচএসসির সময় নির্ধারণ হোক
তাড়াহুড়া না করে দুয়েক বছর হাতে সময় নিয়ে নতুন সময়ে হতে পারে এসএসসি–এইচএসসি পরীক্ষা
মো. রওশন জামাল
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৮:৩১
ডিসেম্বেরে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। এরপর ঘোষণা দিয়েছেন, জানুয়ারি মাসে এসএসসি, জুন মাসে এইচএসসি পরীক্ষা। অর্থাৎ তিনি পরীক্ষা শিডিউলে একটা পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থাকলেও ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে অনেকে। পরীক্ষা শিডিউলের যৌক্তিক পরিবর্তনের সাথে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অবস্থানের সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষিত তুলনা করে একটি পর্যালোচনা সময়ের দাবী।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই দশম শ্রেণি থেকে এসএসসি/সমমানের সনদ পাওয়া পর্যন্ত ১০-১১ মাস সময় লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে জানুয়ারি মাসে দশম শ্রণিতে ক্লাস শুরু থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসে ভর্তি পর্যন্ত ২০ মাস সময় লাগে, যেটা রেকর্ড। অথচ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ের এমন অপচয় নিয়ে কোন মাথা ব্যথা কারোরই নেই। নিয়তির মত মেনে নিয়েছি সবাই। ধরে নিয়েছি এটাই সিস্টেম। সিস্টেম পরিবর্তন করে যদি জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় কমানো যায় তাহলেতো ভালোই। মন্ত্রী মহোদয় হয়তো এমনটাই চেয়েছেন।
নতুন কোন সিস্টেম দেখলেই অভিভাবকরা ভয় পায়, বিরক্ত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষানীতি নিয়ে, শিক্ষার মান নিয়ে, পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি আছে, বিরক্তি আছে , বিষ্ময়ও আছে। জ্ঞান ও দক্ষতার উৎকর্ষের কথা আমরা সবাই বলছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ কাজে লাগাতে যে মানের জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন তা আমাদের নেই। সাড়ে পাঁচ কোটি তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যায় পরিকল্পনার অভাবে। ডিগ্রী আছে, দক্ষতা নেই, ক্রিয়েটিভিটি নেই, উদ্যোগ নেই, ভিশন নেই, স্বপ্ন নেই। শাসকশ্রেণি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই শিক্ষা নিয়ে বড় বড় পরিকল্পনা করে, শিক্ষা কমিশন করে, পাঠ্যক্রমে কিছু পরিবর্তন আনে, কিন্তু কাঙ্খিত অগ্রগতি হয়না।
এ বছর যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে তারা দশম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু করেছিলো ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে। এরা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ক্লাস শুরু করবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবে ২০২৮ সালের জুন/জুলাই মাসে। রেজাল্ট ২০২৮ সালের নভেম্বর ডিসেম্বরে। প্রথম চান্সেই ভর্তি হতে পারলে ২০২৯ সালের জুন মাসের মধ্যে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করবে। রাজনীতি ও আর্থসামাজিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এই ছাত্ররা হয়তো ২০৩৪ সালে স্বাতক (৪ বছর মেয়াদী) পাস করবে। মাস্টার্স করলে আরও ২ বছর। ভাগ্য ভালো হলে শ্রমবাজারে ঢুকবে ২০৩৬ সালের দিকে। বিসিএস পরীক্ষার প্যাকেজে ঢুকলে হয়তো আরও পরে শুরু করবে চাকুরী। ৩২ বছরের সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইবেন না অনেকে। যখন আমাদের মিড ক্যারিয়ারে থাকার কথা তখন সবেমাত্র শিক্ষানবিশ। শ্রমঘন্টা আর জীবনের এমন অপচয় কী আর কোথাও আছে?
অস্ট্রেলিয়াতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দশম শ্রেণি শুরু করা একজন ছাত্র ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে এইচএসসি পাস করবে এবং ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে (অস্ট্রেলিয়াতে অধিকাংশ স্নাতক ডিগ্রী তিন বছর) যখন পাস করে বেরুবে তখন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে ক্লাস শুরু করবে (যদি সেসন জট না থাকে)। তারা আনুষ্ঠানিক চাকুরীতে প্রবেশ করবে ২০৩১ সালে। শুধু সিস্টেমের কারণে একজন ছাত্রের জীবন থেকে পাঁচ বছর হাওয়া। অস্ট্রেলিয়াতে দশম শ্রেনীতে ক্লাস শুরু থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন পর্যন্ত ৬-৭ বছর লাগলেও আমাদের লাগছে ১০-১৪ বছর। নতুন বাংলাদেশে এই জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে– নীতি সহায়তা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে।
দক্ষিন গোলার্ধের দেশ যেমন দক্ষিন আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াতে ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল এ দশম শ্রেণি শুরু থেকে এইচএসসি পাস করা পর্যন্ত সময় লাগে তিন বছর। ভারতে অর্থ বছরের সাথে মিল রেখে একাডেমিক বর্ষ এপ্রিল থেকে মার্চ। এর মধ্যেই পরীক্ষা ও ফলাফল বের হয়। নবম, দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ একই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ি হয়। ইউরোপের দেশগুলোতে সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত স্কুল বর্ষ। সিঙ্গাপুরে মাধ্যমিক (জিসিই ও-লেভেল) এবং উচ্চমাধ্যমিক (জিসিই এ-লেভেল) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে। রেজাল্ট প্রকাশিত হয় জানুয়ারি মাসে।
সময়ের কথা চিন্তা করে এখনও অধিকাংশ ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্যান্ডার্ডাইজড ব্যাচেলরস ডিগ্রী তিন বছর (১৮০ ক্রেডিটস)। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এ স্ট্যান্ডার্ডাইজড ব্যাচেলরস ডিগ্রী তিন বছর। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে এ ডিগ্রী তিন বছর। ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিসিনে ৪-৫ বছর। আমাদের দেশে ঢালাওভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল বিষয় ৪ বছর মেয়াদি। উন্নত বিশ্বে কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা ডিগ্রী ৬ মাস থেকে তিন বছর। বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ডিগ্রী ৪ বছর। পাস করতে সময় লাগে ৫-৬ বছর।
মূল্যবান সময়ের কথা বিবেচনা করে অস্ট্রেলিয়াতে একমাত্র পাবলিক পরীক্ষা (এইচএসসি) ১২ ক্লাস পড়ার পর। দশম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষা স্কুলেই হয় এবং যারা এইচএসসি পড়বে না তাদের সনদপত্রও দেওয়া হয়। অক্টোবরে এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে ডিসেম্বরে রেজাল্ট হয়। এইচএসসির কিছু পরীক্ষা একাদশ শ্রেনীতেও হয়। ব্যবহারিক পরীক্ষা, টিউটোরিয়াল আগেই হয় সেগুলোও চুড়ান্ত ফলাফলে যোগ হয়।
এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষার্থী ২০ লাখ তরুণের সম্মিলিত সময়ের অপচয় যদি হয় ১০০ লাখ বছর তাহলে এর আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি কত শত বিলয়ন ডলার, চিন্তা করেছেন? ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণ জনশক্তির জীবনের অপচয় ঠেকাতে আমাদের কোন পরিকল্পনা আছে?
আমাদের সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক, পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর গবেষণা, ট্রায়াল ও কাটা-ছেঁড়ার গদ্যময় পদ্য আছে। কত কমিশন, কত কমিটি, কত টাস্কফোর্স হয় কিন্তু ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষা হওয়ার পরিকল্পনা এই প্রথম। ব্রিটিশ আমলের মেট্রিকুলেশন, এন্ট্রান্স পরীক্ষা সবই হতো বসন্তে। ডিসেম্বর মাসে কোন পাবলিক পরীক্ষা হয়না, কারণ ডিসেম্বের লম্বা একটা ছুটি থাকে। সবমিলিয়ে ডিসেম্বর মাসে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া কঠিন। মন্ত্রী মহোদয় যদি সত্যিই একটা পরিবর্তন আনতে চান তাহলে অক্টোবরে পরীক্ষা নিয়ে ডিসেম্বের রেজাল্ট দিতে পারেন। জানুয়ারিতে একাদশ শেণীতে ক্লাস শুরু করবে, পরের বছর এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে রেজাল্ট। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভর্তি প্রক্রিয়া। জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু। এসএসসি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত শিক্ষা শৃঙ্খল তৈরী করা যেতে পারে। এসএসসি, এইসএসসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু সরল ও ছন্দময় হতে হবে। এটুকু করতে পারলেই অপচয়ের হাত থেকে বেঁচে যাবে জীবনের মহা-মূল্যবান অনেক সময়।
শিক্ষামন্ত্রীর চিন্তা ভালো কোন সন্দেহ নেই কিন্তু এর বাস্তবায়ন বেশ জটিল। সকল অংশীজনের সহায়তা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। দশম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সমন্বিত ও কমপ্রিহেনসিভ শিক্ষা পরিকল্পনা ও অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি সহ আরও যে সকল বিষয় সেশনজটের জন্য দায়ী সেগুলো বন্ধ করতে হবে। এখানে অস্ট্রেলিয়ার সিস্টেমটাইতো অনুসরণ করা যায়। পরীক্ষা ক্যালেন্ডারটা এমন হলে কেমন হয় – এসএসসি পরীক্ষা অক্টোবর মাসে শুরু করে রেজাল্ট ডিসেম্বরে। এইচএসসি শুরু জানুয়ারি মাসে, ফাইনাল পরীক্ষা পরের বছরের মে মাসে, রেজাল্ট আগস্ট মাসে। ভর্তি পরীক্ষা ও ভর্তি প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় শুরু পরের বছরের জানুয়ারি মাসে। তাড়াহুড়া না করে দুয়েক বছর হাতে সময় নিয়ে হলেও শুরু করা যায়।
মো. রওশন জামাল: প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা এবং বিপিএটিসি স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব)
[email protected]
