ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সংবাদ মাধ্যম

অনলাইনের অ্যালগরিদম যেভাবে বিভ্রান্ত করছে

অনলাইনের অ্যালগরিদম যেভাবে বিভ্রান্ত করছে
×

নাজিয়া আফরিন

নাজিয়া আফরিন

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধরুন বাংলাদেশের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে একই দিনে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একটি হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যস্ত কৃষকদের নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, আরেকটি একজন তারকার বিয়ের ছবি। দিন শেষে ফেসবুক অ্যানালিটিকস বলছে, কৃষকের গল্পে রিঅ্যাকশন বড়জোর শ-দুয়েক; আর তারকার বিয়েতে হাজার হাজার। পরদিনই সম্পাদকীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে–এ ধরনের ‘ভারি’ প্রতিবেদন কমিয়ে আনতে হবে।

দৃশ্যটি কাল্পনিক, কিন্তু যে কোনো বাংলাদেশি নিউজরুমের সঙ্গে পরিচিত যে কেউ জানেন, এটি মোটেও অবাস্তব নয়। বরং এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই ‘স্বাভাবিকতা’র মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে গভীর সংকট।

যখন প্ল্যাটফর্মই সম্পাদক 
বাংলাদেশে এখন নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা সরকারি হিসাবেই দুই সহস্রাধিক। বিটিআরসির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটি ছাড়িয়েছে, যাদের ৯৭ শতাংশ স্মার্টফোনে সংবাদ পড়েন। এই বিশাল ডিজিটাল জনগোষ্ঠীর কাছে সংবাদ পৌঁছানোর পথ মূলত একটাই– ফেসবুক নিউজফিড, ইউটিউব শর্টস বা সার্চ ইঞ্জিন অ্যালগরিদম। কোন খবর প্রচার করা হবে; কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হবে– অনেকটাই নির্ধারণ করছে মার্ক জাকারবার্গের কোম্পানির মুনাফার সমীকরণ; বাংলাদেশের কৃষক বা গার্মেন্টস শ্রমিকের কথা ভেবে নয়।
ভ্যান ডাইক, নিবোর্গ ও পোয়েল তাদের রিফ্রেমিং প্ল্যাটফর্ম পাওয়ার প্রবন্ধে এ বিষয়টিকে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা দেখিয়েছেন গুগল, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম আর শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে এমন এক সামাজিক অবকাঠামো, যা নাগরিকের তথ্যপ্রবাহ, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের মূল প্রশ্ন, এই ক্ষমতাকে কেবল ‘ভোক্তার সুবিধা’ দিয়ে পরিমাপ করলে কি নাগরিকের বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত হয়?

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও জরুরি। কারণ এখানে ‘নাগরিক’ শুধু ঢাকার মধ্যবিত্ত স্মার্টফোন ব্যবহারকারী নন। এর মধ্যে আছেন পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ, সুন্দরবনের জেলে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাদের গল্প অ্যালগরিদমের কাছে কতটুকু ‘এনগেজিং’?

সম্মতি উৎপাদনের কারখানা, এখন ডিজিটাল
নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হার্মান ১৯৮৮ সালে ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্টে দেখিয়েছিলেন কীভাবে করপোরেট মিডিয়া মুনাফার যুক্তি, বিজ্ঞাপনের চাপ এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এমন ‘সম্মতি’ তৈরি করে, যা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যায়। অস্বস্তিকর গল্পগুলো নানা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে ঝরে পড়ে কখনও মালিকের ইশারায়, কখনও সম্পাদকের সেল্ফ সেন্সরশিপে।
বাংলাদেশে এই সেল্ফ সেন্সরশিপের মাত্রা ভয়ানক আকার নেওয়ার পেছনের চিত্র আরও ভয়াবহ।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ৯৭ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং ২৫৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে সমন্বিত হামলা হয়েছে। আরএসএফের ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম।
এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল যুগে চমস্কির ফিল্টারগুলো আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়েছে। মালিকের সরাসরি ফোনের দরকার নেই। অ্যালগরিদম নিজেই ‘অস্বস্তিকর’ গল্পকে কম দৃশ্যমান করে দেয়। ফেসবুকের অ্যালগরিদম ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফেসবুকের অ্যালগরিদম উত্তেজক, পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনৈতিক কনটেন্টকে এনগেজমেন্টের স্বার্থে প্রাধান্য দেয়। দ্য প্ল্যাটফর্ম সোসাইটি গ্রন্থে ভ্যান ডাইক ও তাঁর সহলেখকরা এই প্রক্রিয়াকে ডেটাফিকেশন, কমোডিফিকেশন ও সিলেকশন– এই তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করেছেন। এ তিন প্রক্রিয়া মিলে সংবাদকে পরিণত করে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে। যার মূল্য নির্ধারিত হয় বাজারে; পাঠকের প্রয়োজনে নয়।

ভাইনারের সতর্কবার্তা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
গত মে মাসে লন্ডনের কনওয়ে হলে ‘গার্ডিয়ান’-এর ২০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সম্পাদনা-প্রধান ক্যাথেরিন ভাইনার ঘোষণা করেছিলেন– ‘সাংবাদিকতা কোনো কনটেন্ট বাণিজ্য নয়।’ তিনি সতর্ক করেছিলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সত্যকে অবমূল্যায়ন করছে এবং মানবজাতি এখন ইতিহাসে তুলনাহীন এক তথ্য বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। ভাইনার আরও লিখেছেন, মানুষ এখন একসঙ্গে একাধিক জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি– জলবায়ু দুর্যোগ, যুদ্ধ, গণতান্ত্রিক অস্থিতিশীলতা, বৈষম্য ও একাকিত্ব এবং এসব সংকট আলাদাভাবে নয়, পরস্পরকে শক্তিশালী করে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে জনজীবন পূর্ণ হয়ে উঠছে খণ্ড খণ্ড চিত্রে। 

বাংলাদেশের পাঠক এই বর্ণনায় নিজেদের হুবহু মিলিয়ে নিতে পারবেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় দেখা গেছে কীভাবে ফেসবুক, টিকটক ও টেলিগ্রামের অ্যালগরিদম একই সঙ্গে আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এবং বিদ্বেষমূলক মিথ্যা তথ্য ছড়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ‘দুমুখো তলোয়ার’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের একই সময়ে নাগরিক ক্ষমতায়ন ও ক্ষতির হাতিয়ার হয়ে ওঠার প্রবণতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সামনে এক জটিল প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

অদৃশ্য গল্পের দাম
গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি আন্দোলন, ধর্ষণ মামলায় বিচার বিলম্বিত হওয়ার ধারাবাহিক প্যাটার্ন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন– এই গল্পগুলো ফেসবুকে ভাইরাল হয় না। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক ‘বিনোদন’ দেয় না। কিন্তু এগুলোই একটি সমাজের সত্যিকারের আয়না। যখন অ্যালগরিদম সেই আয়নাকে ঢেকে দেয়; ক্ষমতাবানরা জবাবদিহির বাইরে চলে যান।
ভাইনার তাঁর বক্তৃতায় মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে আজকের তথ্য-বিপ্লবের তুলনা করেছেন। সেই রূপান্তর মানবজাতির জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকর হয়েছিল, কিন্তু তার আগে এসেছিল যুদ্ধ, বিভেদ ও দাহ। আমাদের কাজ সেই ‘দাহ হওয়ার পর্যায়’ যত দ্রুত সম্ভব পেরিয়ে যাওয়া।

অর্থ উৎপাদনের রাজনীতি
সাংবাদিকতার ভূমিকা শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, অর্থ উৎপাদনও। একটি প্রতিবেদন শুধু বলে না ‘কী হয়েছে’। বলে, ‘এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী’। কিন্তু যখন সেই অর্থ নির্মাণ প্রক্রিয়াটি অ্যালগরিদমের হাতে চলে যায়, সাংবাদিকতা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি হারিয়ে ফেলে।
চমস্কির ভাষায়: যে মুহূর্তে সংবাদমাধ্যম কেবল বাজারের যুক্তিতে চলে, সেই মুহূর্তে সে আর জনগণের পক্ষে কথা বলে না। বলে ব্যবস্থার পক্ষে। ভাইনারের ভাষায়: সাংবাদিকতা ‘কনটেন্ট বাণিজ্য’ নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক নাগরিক জীবনের অবকাঠামো, গণতন্ত্রের সংযোগী কলকবজা।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে তাই এ মুহূর্তে দুটো কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রথমত, ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন-বাস্তবতাকে অস্বীকার করে চলা যায় না। দ্বিতীয়ত, সেই ডিজিটাল ব্যবস্থার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ না করে প্রশ্ন করা; আমরা কার জন্য সাংবাদিকতা করছি? অ্যালগরিদমের ক্ষুধা মেটাতে, নাকি সেই কৃষকের কথা বলতে, যার গল্প কয়েকশ রিঅ্যাকশনেই থেমে যায়?
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সাংবাদিকতার সামনে দুটি শত্রু একসঙ্গে– ক্ষমতা কাঠামোর দমনপীড়ন ও বাজারের অ্যালগরিদম। একটি সাংবাদিককে কারাগারে পাঠায়, আরেকটি তাঁর গল্পকে ফিডের অতলে ডুবিয়ে দেয়। উভয়ের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হবে এবং সে লড়াই শুধু নিউজরুমের নয়; পাঠকেরও।

নাজিয়া আফরিন: সাংবাদিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন

×