ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

পৃষ্ঠপোষকের নামহীন সন্ত্রাসীর তালিকা

রাঘববোয়াল রাখিয়া চুনোপুঁটির কারবার

রাঘববোয়াল রাখিয়া চুনোপুঁটির কারবার
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর আটটি থানার সন্ত্রাসীদের নাম লইয়া মহানগর পুলিশ যেই নূতন তালিকা প্রণয়ন করিয়াছে, সেইখানে ১৮১ জনের নাম থাকিলেও সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা কাহারও নাম নাই। স্পষ্টত বাহিনীটি কার্যত রাঘববোয়ালদের নিষ্কৃতি দিয়া এখনও চুনোপুঁটি লইয়াই ব্যস্ত; সামগ্রিক অপরাধ চিত্রে যাহার কোনো প্রভাবই পড়িবে না। অপরাধীর তালিকা করিতে গিয়া পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদারদের নাম বাদ দিবার এই অঘটন উদ্বেগজনক না হইয়া পারে না। অন্তত এই-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা এইরূপ কথাই বলে। 

আমরা দেখিয়াছি, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় দেশে যখনই অপরাধমূলক ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছে, তখনই একটা করিয়া কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা করা হইয়াছে। সেই তালিকা ধরিয়া বিস্তর গ্রেপ্তার অভিযান চলিয়াছে। এমনকি অনেকে ধরাও পড়িয়াছে। কিন্তু যখনই পরিস্থিতি কিছুটা শীতল হইয়াছে; সংবাদমাধ্যমে খুন-ধর্ষণের ন্যায় গুরুতর অপরাধ লইয়া আলোচনা কমিয়া গিয়াছে; তখনই উক্ত গ্রেপ্তারকৃতদের পৃষ্ঠপোষকরা তৎপর হইয়া বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ পন্থা অনুসরণ করিয়া প্রথমোক্তদের জামিনে ছাড়াইয়া আনিয়াছে। বিষয়টা এখানেই শেষ হয় নাই। জামিনে মুক্ত অপরাধীরা পুনরায় অপরাধকর্মে লিপ্ত হইবার পর সংবাদমাধ্যমে যখন উহার সমালোচনা হয় তখন পুলিশ নিজ পক্ষে সাফাই গাহিয়া বলে, অনেক কষ্ট করিয়া গ্রেপ্তারের পর আদালত অপরাধীকে জামিন দিয়াছেন। ইহাতে তাহাদের কষ্টটুকু মাঠে মারা গিয়াছে। উপরন্তু পুলিশ এমনও অভিযোগ করে, সাধারণ মানুষ পুলিশকে সহযোগিতা করিতে চাহে না; মামলায় সাক্ষ্য দেয় না। অসহযোগিতা করিলে পুলিশের পক্ষে সকল কিছু নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। অন্যদিকে আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলেন, আইনের উপযুক্ত ধারা প্রয়োগ না করা; তৎসহিত পুলিশ যথার্থ তদন্ত করিতে না পারায় আদালত অপরাধীদের জামিন দিতে বাধ্য হইয়াছেন।

উল্লেখ্য, শুধু গত পাঁচ মাসে খুলনা মহানগরীতে খুন হইয়াছেন ১৬ জন। খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্ট হইতে গত মে মাস পর্যন্ত ২২ মাসে সেখানে ৮৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছে। তন্মধ্যে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সহিত বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত। এই অবস্থায় এমনকি খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনাকে ‘আতঙ্কের শহর’ আখ্যা দিয়াছেন। এ প্রেক্ষাপটেই থানাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের নূতন তালিকা প্রণয়নকার্য শুরু হয়। সেই তালিকাও যে ফল দিতেছে, তাহা বলা যায় না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানগরীতে গত তিন দিবসের যৌথ অভিযানে 
মাদক বিক্রেতাসহ ১২৯ অপরাধীকে গ্রেপ্তার হইয়াছে, যেখানে তালিকাভুক্ত মাত্র দুইজন। 

সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকদের নাম না থাকিবার কারণে এই পরিস্থিতিতে কেহ যদি অভিযোগ করেন, অপরাধের প্রকৃত উৎস পুলিশ গোপন করিতে চাহিতেছে, তাহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না। প্রশ্ন উঠিতে পারে, তবে কি অসাধু পুলিশ সদস্যদের সহিত অপরাধীদের ‘ওপেন সিক্রেট’ সম্পর্ক এখনও বহাল? বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ হইলেও ফুৎকারে উৎক্ষেপ করিবার অবকাশ নাই। তবে স্মরণে রাখিতে হইবে, সমাজের প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা না পাইলে কোনো অপরাধীর পক্ষেই টিকিয়া থাকা সম্ভব নহে। আবার ইহাও সত্য, ক্ষমতাসীনদের কোনো প্রকার প্রশ্রয় বা আশীর্বাদ ব্যতীত পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদারেরই তবিয়ত বহাল থাকা অসম্ভব। সম্ভবত এই কারণেই আলোচ্য তালিকায় সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকদের নাম নাই।

আমরা মনে করি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, তৎসহিত সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও দ্রুত আলোচ্য বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। অতীতের ন্যায় অপরাধ দমনের নামে চক্ষে ধূলি দেওয়া হইলে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতিই ঘটিবে না; সরকারের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হইবে। শুধু খুলনা নহে, সর্বত্রই সন্ত্রাসী ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হউক। 
 

আরও পড়ুন

×