ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সমাজ

মাতা-পিতার গুরুত্বের দর্শন, আইন ও মূল্যবোধ

মাতা-পিতার গুরুত্বের দর্শন, আইন ও মূল্যবোধ
×

মো. সুমন জিহাদী

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বার্ধক্যে পিতামাতার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ বিষয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। তাদের অবহেলার দায়কে আইন ও মূল্যবোধের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল। এক দল বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যারা বাবা-মা বা বয়স্ক অভিভাবকদের দেখাশোনা করছেন না তারা ভয়ংকর অপরাধী এবং তাদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হওয়াই উচিত। আরেক পক্ষের মতে, সন্তান হিসেবে বাবা-মাকে দেখভাল করা সন্তানের জন্য বাধ্যতামূলক কিছু নয়। 

সামাজিকভাবে আমরা যেটিকে বলছি পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য; রাষ্ট্রীয়ভাবে সেটি বয়স্ক নাগরিক ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পরিবার প্রথা, গোত্র প্রথা এবং সব শেষে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে পূর্ববর্তী প্রজন্মের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের আচরণগত চর্চা মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং বৃদ্ধ পিতা-মাতা বা নাগরিকদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে সন্তানের ও রাষ্ট্রের দায়বিষয়ক আলোচনাকে তিনটি দর্পণ থেকে দেখা যেতে পারে। প্রথমটি দার্শনিক দর্পণ, দ্বিতীয়টি আইনি দর্পণ এবং তৃতীয়টি মূল্যবোধের দর্পণ। 

২০১৫ সালে ডেভিড ওয়াশরম্যান তাঁর বিখ্যাত আর্টিকেল ‘ইজ দেয়ার আ রাইট নট টু বি বর্ন’-এ উল্লেখ করেন, জন্ম দেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পৃথিবীর সব প্রাণী, উদ্ভিদ বংশবিস্তার করে এবং এখানে নবাগতের সম্মতি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, তখন তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। এ কারণে এ ব্যাপারে অধিকার লঙ্ঘনের কিছু নেই। অতএব, সন্তান তো জন্ম নিতে চায়নি– এই  যুক্তি আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

গবেষক অধ্যাপক জেন ইংলিশ তাঁর ‘হোয়াট ডু গ্রোন চিল্ড্রেন ওউ দেয়ার প্যারেন্টস’ নিবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন, বাবা-মায়ের দেখাশোনার বিষয়টি সন্তানের জন্য কোনো ঋণ নয়। বাবা-মা সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে ঋণী বানাতে পারেন না- সেই ঋণ সন্তানকে পরিশোধ করতে হবে। জেন ইংলিশ পরিষ্কারভাবে বলেছেন, সমাজে অন্যান্য সম্পর্কের মতো পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, আবেগঘন ও জোরালো। তাই পারস্পরিক দেখাশোনা, পরিচর্যা সম্পূর্ণই সম্পর্কের অধিকার। 

ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজভেদে সেই সম্পর্ক যেমন ভিন্ন হতে পারে; দায়িত্ব-কর্তব্য পালনেও কমবেশি হতে পারে। দার্শনিকভাবে এখানে কেয়ারগিভিং বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ করতে খুব বেশি গবেষককে দেখা যায়নি। সুতরাং, বার্ধক্যে বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন সন্তানরা করবে কি করবে না, তা নির্ধারিত হয় তাদের পিতা-মাতা হিসেবে সম্পর্কের ভিত্তিতে; জন্ম দেওয়ার ঋণের ভিত্তিতে নয়। এ কারণে আরেক দল মনে করে, বার্ধক্যে নাগরিককে সেবা-পরিচর্যা করার একমাত্র দায় সন্তানের না, বরং এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। 

রাষ্ট্র কিছু বাস্তবায়ন করতে চাইলে সেখানে আইন প্রয়োজন হয়। কোনো কোনো আইনে সন্তানদের বাধ্য করা হয়েছে পিতা-মাতাকে দেখভাল করার জন্য। আবার কোথাও কোথাও সন্তানদের ছাড় দিয়ে রাষ্ট্র অনেকটা দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার পিতা-মাতাকে দেখাশোনার বিষয়ে কোনো বিশেষ আইন প্রণয়ন করেনি। তবে কিছু প্রাদেশিক আইনে বলা আছে, ‘সন্তানরা, নাতি-নাতনিরা পরিবারে বয়স্ক সদস্যদের যত্ন ও দায়িত্ব নিতে পারবে।’ তবে বয়স্ক নাগরিকদের রাষ্ট্র কর্তৃক সেবা নিশ্চিত করার জন্য মার্কিনিরা প্রণয়ন করেছে ‘ওল্ডার আমেরিকান্স অ্যাক্ট-১৯৬৫’। জার্মানিতে জার্মান সিভিল কোড অনুযায়ী ‘রিলেটিভস ইন দ্য ডিরেক্ট লাইন আর অবলাইজড টু সাপোর্ট ওয়ান অ্যানাদার’ উল্লেখ রয়েছে। সে দেশে সন্তানরা বছরে ন্যূনতম এক লক্ষ ইউরো আয় না করলে তারা পিতা-মাতাকে দেখভাল করতে বাধ্য নয়। সেখানে বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্য ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা আছে, সরকারি ওল্ডহোম রয়েছে। বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’। এ আইনে সন্তানদের দায়বদ্ধ করা হয়েছে বৃদ্ধ পিতা-মাতার মতামত অনুযায়ী তাদের যত্ন নেওয়ার জন্য এবং আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধানও এখানে আছে। 

দার্শনিক ও আইনি ভিত্তির সঙ্গেই সমান্তরালে চলছে আমাদের মূল্যবোধ। ইতিহাস, ধর্ম ও সামাজিক গল্পের মধ্যেও প্রবীণ নাগরিকরা সম্মানের পাত্র; অভিজ্ঞতার মানদণ্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ইদানীং আমাদের মূল্যবোধের উপাদানগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। জীবনের গতি, সন্তানদের পেশাগত চাপ, পুঁজিবাদী সমাজে প্রত্যেকে টাকার পেছনে ছুটতে গিয়ে সামাজিক সম্পর্কগুলোর প্রতি সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয় না। 

সন্তান ও রাষ্ট্র উভয়কেই আন্তরিক ও দৃঢ় হতে হবে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ব্যবস্থাপনায়। নিজেদের ঘরে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের অবস্থান নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে; একইভাবে ওল্ডহোমগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রের নজরদারিতে এনে গুণগত মান বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে।

মো. সুমন জিহাদী: পিএইচডি গবেষক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড

আরও পড়ুন

×