ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

কর-আওতা যেভাবে বাড়ানো যায়

কর-আওতা যেভাবে বাড়ানো যায়
×

নুরুল আমিন

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের রাজস্ব ঘাটতির বিষয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। নানা ফন্দিফিকির করেও কর-জিডিপির হার ৭ শতাংশে রাখা যাচ্ছে না, যদিও একসময় তা ছিল ১১ শতাংশ; বহু দেশে তা ১৫-২০ শতাংশ। সম্ভবত এ কারণেই এনবিআর বিগত দিনের নিষ্পত্তি করা ফাইল পুনর্মূল্যায়নের জন্য হাতে নিয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, এসব মূল্যায়নে করদাতার হয়রানি বাড়ে। 

সরকার রাজস্ব বাড়ানোর জন্য দুর্নীতি কমাতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি? দুদকে গত আড়াই মাস তো কোনো কমিশনই নেই। কিছুদিন আগে ঢাকার অদূরে একটি জমি নিবন্ধন করতে গিয়ে সাবরেজিস্ট্রারের মুখোমুখি হই এবং তিনি লোক মারফত ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চান। দুদকের হট নম্বরে ফোন করে সেবার নিস্তার পেয়েছিলাম। পরে ওই অফিসে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সাবরেজিস্ট্রারের দৈনিক আয় নাকি ৮-১০ লাখ টাকা এবং প্রতিদিনের আয়ের টাকা বিদেশে মেয়ের কাছে হুন্ডি করে পাঠিয়ে দেন। এ রকম কর্মকর্তা কাস্টমস ও কর বিভাগেও আছেন। এখন কোথাও অবৈধ আয় অর্জনে ভয়-ভীতি, লজ্জা-শরমের বালাই নেই। অথচ গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সরকার তো এ রকম হওয়ার কথা নয়। 

দুদকের পাশেই আছে একটি কাস্টমস বন্ড অফিস। ব্যবসায়ীদের আয় না বাড়লেও দিন দিন তাদের ঘুষের রেট বাড়ছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আশা করব, তিনি দু-একজন বড় কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় এনে সবাইকে সতর্ক করবেন। এ তিন বিভাগের ঘুষ কমলে ব্যবসায়ী ও জনগণের আয় বাড়ত; সঙ্গে বাড়ত কর।
সরকার দুর্নীতি নিয়ে জিরো টলারেন্সের কথা বলছে। কিন্তু মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা বলছে না। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দুর্নীতি আমাদের জিডিপির ২ শতাংশ খেয়ে ফেলছে। ঢাকা শহরের নাম করা বেসরকারি হাসপাতালের একজন ব্যস্ত সার্জনের কমিশন বা বেতন কত হয়, তা সচেতন নাগরিক মাত্রেই জানা। এনবিআরও হয়তো জানে, কিন্তু কৌশলের অভাবে উপযুক্ত হারে আয়কর আদায় করতে পারছে না। দেশে এক কোটি টিআইএনধারী থাকলেও সবাই রিটার্ন দাখিল করেন না এবং কর দেন আরও কম লোক। 

করের আওতা উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বছরে অন্তত দুই হাজার টাকা বাধ্যতামূলক কর বসালে তাদের তেমন কোনো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। হয়রানি ছাড়া আদায় করা হলে অনেকেই কর প্রদানে উৎসাহী হবেন। উপজেলা পরিষদ থেকে এক-দুই হাজার টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স নিতে বাধ্য করা যায় বা দোকানদার নিজেই ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে চালান সংরক্ষণ করবেন। একজন খুদে দোকানিও সরকারকে বছরে এক হাজার টাকা দিতে পারেন যদি হয়রানি না থাকে। তিনি এখন স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার লোকজনকে হয়তো বছরে এর চেয়ে বেশি টাকা দিচ্ছেন– এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। 
এভাবে না এগোলে সরকার টাকা কোথায় পাবে? সরকার শুধু ভ্যাট, উৎসে কর, আমদানি-রপ্তানি করের ওপর নির্ভর করলে কিংবা গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকবে না। বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষও ক্ষুব্ধ হবে। কর আদায়ে সরকারের সদিচ্ছা ও সততাই বড় বিষয়। জনগণ যখন দেখে, সরকারের লোকজন দুর্নীতি করছে এবং সরকার তা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তখন জনগণ হতাশ হয় এবং কর দেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। 

নুরুল আমিন; সাবেক ছাত্র, অর্থনীতি বিভাগ, চবি

আরও পড়ুন

×