ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিন

হিমন্ত, শুভেন্দু এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী

হিমন্ত, শুভেন্দু এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী
×

সম্প্রতি বাংলাদেশের পঞ্চগড় সীমান্ত ভারতীয় বাহিনী বিএসএফেরপুশ ইন, এরপর শূন্যরেখায় রাত যাপন

শশাঙ্ক তিওয়ারি

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৮:১৫ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৯:২৯

বেশির ভাগ রাতেই, মুষ্টিমেয় কিছু লোককে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি নির্জন ও বেড়াবিহীন অংশে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাহারায় না থাকলে তারা অন্ধকারে হেঁটে সীমান্ত পার হয়। সকাল নাগাদ তারা আমার নয়, অন্য কারও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এটা গোয়েন্দা ফাইল থেকে ফাঁস হওয়া একটি তথ্যের মতো শোনালেও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক সাক্ষাৎকারে অবৈধ অভিবাসীদের সম্পর্কে কমবেশি এমনই বর্ণনা দিয়েছেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সন্দেহভাজন নথিভুক্ত নয়– এমন বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো একটি ধীর ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। কারণ, ঢাকা সহজে তাদের গ্রহণ করে না এবং এই বিষয়ের জন্য কোনো কার্যকর প্রত্যর্পণ ব্যবস্থাও নেই। তাই রাষ্ট্র রাতের জন্য অপেক্ষা করে। তাঁর নিজের ভাষায়, তাদের একটি সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে গিয়ে কার্যত ঠেলে সীমান্ত পার করে দেয়। তিনি এই প্রক্রিয়াটিকে ‘পুশব্যাক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। যদিও বাংলাদেশ একে ‘পুশইন’ বলে। পরবর্তী দিনগুলোতে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করে এবং প্রতিবাদ জানাতে ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে।
২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে মাথা ঘামানো বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী এখন শুধু হিমন্ত শর্মা নন। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর একজন নতুন এবং সমান লড়াকু সমকক্ষ রয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় বিজেপির ভূমিধস বিজয় কলকাতার মতোই গুয়াহাটিতেও উদযাপিত হয়েছিল। ২০২০ সালে তৃণমূল থেকে দলত্যাগ করে পাঁচ বছর বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের সর্বপ্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। আসামে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পুনর্নির্বাচিত শর্মা পশ্চিমবঙ্গের ফলকে ‘ভারতের বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ছিল মমতা ব্যানার্জীর হাতে, যার হিসাবনিকাশ গড়ে উঠেছিল বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটার এবং সীমান্ত জেলাগুলোতে তার শক্তিশালী জনভিত্তি ঘিরে। এখন প্রথমবারের মতো পাঁচটি রাজ্যজুড়ে চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার বিস্তৃত সমগ্র ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পরিচালিত হবে বিজেপি ও তার মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত একটি সরকার দ্বারা, যারা অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

দুই মুখ্যমন্ত্রী, এক সীমান্ত
যদিও শর্মা এবং অধিকারীর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস জড়িত, তাদের ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক শৈলী অনেকটাই ভিন্ন। অসমীয়া পণ্ডিত ও কবির পুত্র শর্মা কামরূপ জেলার জালুকবাড়ির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং অভিবাসনের সঙ্গে অসমের দীর্ঘ ও কঠিন সম্পর্কের প্রভাব তাঁর ওপর আছে। রাজ্যের পরিচয় সংকট এবং এই ভয় যে আদিবাসী অসমীয়া সংস্কৃতি, ভাষা এবং জনবিন্যাস বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এই সংকটের ভেতর দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবন এগিয়েছে– অসম আন্দোলনের দশকগুলোতে, নাগরিকত্ব বিতর্ক যা থেকে জন্ম নিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি), ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন (এএফএসপিএ) এবং বিদ্রোহের বছরগুলোতে। শুধু ২০২৬ সালেই তিনি এক্সে  (সাবেক টুইটার) অন্তত ২৩টি পোস্ট করেন, যেখানে ‘পুশব্যাক’ অভিযানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি লিখেছিলেন, ‘লাতোঁ কে ভূত বাতোঁ সে নহি মানতেঁ,’ (মন্তব্যটির মোটামুটি অনুবাদ হলো ‘শক্তি কাজ করে, অধিকার করে না’), সাথে ছিল ২০ জনের একটি ঝাপসা ছবি, যাদের তিনি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সরকার ২০২৫ সালে এক হাজার ৪০০ জনকে সীমান্ত পার হতে বাধ্য করেছে এবং প্রতিদিন ২০ জনকে ফেরত পাঠাচ্ছে। তিনি একবার আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছিলেন: ‘আসাম একটি মেরূকৃত সমাজ, বাঁচতে চাইলে আগামী ৩০ বছর আমাদের মেরূকরণের রাজনীতি করতে হবে... একজন অসমীয়া হিসেবে আমি আত্মসমর্পণ করতে চাই না। আমি লড়ব, আমি মেরূকরণ করব। কিন্তু এই মেরূকরণ হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে নয়; এই মেরূকরণ অসমীয়া ও বাংলাদেশিদের মধ্যে... আমরা অসমীয়া মুসলিমদের সঙ্গে লড়াই করি না। আমরা শুধু বাংলাদেশি মুসলিমদের সঙ্গে লড়াই করি।’
অন্যদিকে অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির একটি রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন (তাঁর বাবা শিশির কুমার অধিকারী, একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, যিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন এবং পরে কাঁথি লোকসভা আসন থেকে একাধিকবার জয়ী হয়েছেন)। বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও বেশি লেনদেনমূলক, আরও বেশি আঞ্চলিক, আরও বেশি বাঙালিসুলভ। তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি গঙ্গা-পদ্মা ব-দ্বীপকে একটি যৌথ সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে বোঝেন, অথচ এর অপর পারের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধেই প্রচার চালান।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা হিসেবে বছরের পর বছর তিনি ঢাকার আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সদ্ভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০২০ সালে দলত্যাগ করে বিজেপিতে আসার পরে এবং তাঁর ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের প্রায় পুরোটাই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ নিয়ে মত্ত থাকলেও শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে তিনি নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনার কাছ থেকে একটি অভিনন্দন বার্তা পেয়েছিলেন। শপথ গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর প্রথম বড় সীমান্ত পদক্ষেপ ছিল বেড়া দেওয়ার জন্য সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূখণ্ড হস্তান্তরের ঘোষণা। তিনি একটি ‘শনাক্ত করো, মুছে ফেলো, বহিষ্কার করো’ নীতি ঘোষণা করেন, যার মধ্যে আছে: সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে সরকারি ডেটাবেজ থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে এবং নির্বাসনের জন্য বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
দুই মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে যে মিলটি রয়েছে, তা হলো পদ্ধতি ও বার্তার ক্ষেত্রে এক ধরনের সৌহার্দ্য। দুজনেই সীমান্তকে তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখেন, কোনো গৌণ নিরাপত্তা বিষয় হিসেবে নয়। তারা নিজেদের এমন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন যারা ‘তোষণ রাজনীতি’র অবসান ঘটাচ্ছেন এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছেন। তারা বোঝেন যে, মুসলিম পরিচয়ধারী বাংলাদেশি অভিবাসীই পূর্বাঞ্চলে জনগণকে সংগঠিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতীক, যা ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত নির্বাচকমণ্ডলীকে আসনে রূপান্তর করার একটি উপায়। এই দুই ব্যক্তি যে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক গল্পটি বলেন, তা-ই তাদের এই রাজনীতির কাঠামো এবং তারা এ বিষয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, যদিও তারা জানেন যে সংখ্যাটা তথ্যগতভাবে ব্যর্থ হলেও আবেগগতভাবে কাজ করে।
শর্মা বারবার দাবি করেছেন যে, আসামের মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৫১ সালের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীরা বারবার এর বিরোধিতা করে যুক্তি দেখিয়েছে যে, ২০১১ সালের পর কোনো জনশুমারি হয়নি, যখন মুসলিমরা জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ ছিল এবং ১৯৫১ সালের এই সংখ্যাটি ১২ শতাংশ নয়, বরং ২৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু শর্মা একজন সহানুভূতিশীল সাংবাদিকের বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ২০৪১ সালের মধ্যে আসাম একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হয়ে উঠতে পারে। তিনি এই আশঙ্কার উদ্রেক করেছেন যে, যদি রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশ অতিক্রম করে, তবে আসামকে বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করা হবে।
অধিকারীর হিসাব ততটা ভয়াবহ নয়, বরং বেশি নির্বাচনী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খাওয়ার পর, অধিকারী কলকাতায় একটি কার্যনির্বাহী সভা ডাকেন, অভিযোগ মতে, যেখানে তিনি বলেন যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৯১ শতাংশ মুসলিম মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে এই হার ছিল ৯৫ শতাংশ। সুতরাং লক্ষ্য ছিল হিন্দু ভোটকে একত্র করা। হলদিয়ার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘বিজেপির ঝুলিতে যদি আরও ৫ শতাংশ হিন্দু ভোট আসে, তাহলে আমরা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জিতব।’ ওই পাঁচ শতাংশ ভোটকে একত্র করার মাধ্যম ছিল এই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) যদি এই আখ্যানকে একটি প্রশাসনিক কাঠামো না দিত, তবে তা হয়তো কথার কথাই থেকে যেত। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়, যার ফলে মোট ভোটার সংখ্যা ৭.৬ কোটি থেকে কমে ৬.৭ কোটিতে দাঁড়ায়। যদিও বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ ছিলেন হিন্দু এবং ৩৪ শতাংশ মুসলিম, কিন্তু এই বাদ পড়ার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। উচ্চ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সমস্ত জেলাতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ে। রাজ্যের সর্বোচ্চ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ ৪.৫৫ লাখ ভোটার হারায়। উত্তর ২৪ পরগনা, সীমান্তবর্তী সেই জেলা যেখানে বিএসএফের সবচেয়ে বিতর্কিত বেড়ার অংশটি অবস্থিত, ৩.২৫ লাখ মানুষ হারিয়েছে। মালদা, বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়াও একই পথের পথিক ছিল।
যদি ‘পুশব্যাক’ নীতি মানুষকে বাস্তব সীমান্তের ওপারে বিতাড়িত করে থাকে, তবে এসআইআর আমলাতান্ত্রিক সীমান্তের ওপারে মানুষকে বিতাড়িত করেছে।

একটি কূটনৈতিক সংকট
বাংলাদেশ শাসন করছেন তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ নির্বাসন থেকে ফিরে এসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে নয়াদিল্লি সম্পর্কে সন্দিহান এবং এর প্রধান বিরোধী দল, জামায়াতে ইসলামী, প্রকাশ্যে বৈরী। ফলে পুশব্যাক নীতিটি কূটনীতির অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৪৭৯ জনকে জোর করে সীমান্ত পার করিয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জনকে সীমান্তের ওপারে ফেলে দেওয়া ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ‘জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ’ সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত-ব্যবস্থাপনা চুক্তির লঙ্ঘন বলে প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা একাধিক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে; ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করেছে; জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছে; এবং বিজিবিকে শারীরিক প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছে।
জানা গেছে, লালমনিরহাটে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সমর্থনে বিজিবি সদস্যরা কয়েক ডজন মানুষকে জোর করে পার করানোর ক্ষেত্রে বিএসএফকে বাধা দেয়, ফলে একটি দল জিরো লাইনে আটকা পড়ে, যাদের কোনো পক্ষই গ্রহণ করেনি। বাংলার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দেয় যে, নতুন সরকারের অধীনে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ বাড়লে তারা ‘ব্যবস্থা’ নেবে। একটি রাজ্যের নির্বাচন প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল।
তবে এটি কূটনৈতিক পরিস্থিতির অবাস্তবতা প্রকাশ করে না। এই সংখ্যাগুলো হজম করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে কারণ এগুলো একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন কাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যমান, যা ভারত অবশ্যই অনুসরণ করার জন্য জোর দেয়। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, নয়াদিল্লি ঢাকাকে একটি নোট পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় যাচাইয়ের অপেক্ষায় থাকা দুই হাজার ৮৬২টি মামলার কথা জানায় এবং প্রকাশ্যে প্রত্যাবাসনকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘প্রধান বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের নিজেদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই বিষয়ে ঢাকার সাথে এক হাজারেরও বেশি কূটনৈতিক নোট আদান-প্রদান করেছে, যার মধ্যে অন্তত ৪৫০টি সমন্বিত স্মারকলিপিও রয়েছে, কিন্তু কোনো কার্যকর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কিন্তু একটি অদ্ভুত বিষয় হলো ভারতের পাঠানো নোটটির সময়কাল। এটি ঢাকা সমনের কয়েক ঘণ্টা পরেই পাঠানো হয়েছিল। ওই সমনে পুশব্যাক বিষয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার টেলিভিশনে প্রচারিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানাতে ভারপ্রাপ্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পবন কুমার বাধেকে ডাকা হয়েছিল। অর্থাৎ অবৈধ অনানুষ্ঠানিক বহিষ্কারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিবাদের জবাবে ভারত কালক্ষেপণ না করে আইনি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অসহযোগিতা নিয়ে তার অভিযোগ উত্থাপন করেছে। একই সপ্তাহে দুই সরকার একে অপরকে হুবহু একই ধরনের অসততার জন্য অভিযুক্ত করছিল।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি
এই সংকটের মধ্যে ভারত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে। ত্রিবেদী একজন বাঙালি এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর থেকে প্রাক্তন সংসদ সদস্য। তিনি রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত ব্যক্তি, যা একটি বিরল ঘটনা। কারণ, এমন একটি পদে প্রায় সব সময়ই একজন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পছন্দটি তাই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ নয়াদিল্লি কিছু একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
ভারত কেন এই বিশেষ মুহূর্তে দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে তা বুঝতে হলে, ভারত কী থেকে নিজেকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে তা বোঝা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। কারণ, সরকার ভারতবিরোধী কিছু শক্তিকে (জামায়াত ও অন্যান্য মৌলবাদী শক্তি) মুক্তি দিয়েছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন ইউনূস ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেন, যা বিশেষভাবে দেখা যায় চীন সফরকালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর করা মন্তব্যে। এই মন্তব্যগুলো ভারতের কৌশলগত মহলে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি করে। এই রাজনৈতিক সংঘাত শিগগিরই একটি অর্থনৈতিক মাত্রা লাভ করে। ভারত এর জবাবে একাধিক বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল পণ্য স্থানান্তর সুবিধার ওপর নিষেধাজ্ঞা, বন্দরে প্রবেশাধিকার কঠোর করা এবং ভিসার ওপর বিধিনিষেধ। একই সময়ে নয়াদিল্লি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করে যে ঢাকা পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে তুলছে, যা তার মধ্যে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
এই প্রেক্ষাপটেই বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, ভিসা পরিষেবা স্থগিত এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতি বিস্তারের মধ্যে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এবং তারেক রহমানের বিএনপি বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসে। এরপর বিজেপি এবং বিএনপির মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি লক্ষণীয় প্রচেষ্টা দেখা যায়। সম্পর্কটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এটি দলীয় যোগাযোগের একটি মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা অনেকটা একসময় আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যের মতো।
কিন্তু ত্রিবেদীকে যে সুযোগের দরজা দিয়ে ঢুকতে বলা হচ্ছে তা খুবই সংকীর্ণ। কারণ, একই দলের দুজন সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজ্যপর্যায়ের নেতা (শর্মা ও অধিকারী) প্রতিদিন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের প্রতি প্রকাশ্যে বৈরিতা প্রদর্শন করছেন। ত্রিবেদী সেই বিজেপির ভিজিটিং কার্ড নিয়েই প্রবেশ করবেন, যে বিজেপি এই দুই নেতাকে সমর্থন করে। সংক্ষেপে বিজেপি নিজেই পরিস্থিতিটিকে সমাধান করা কঠিন করে তুলেছে।

হাসিনার ছায়া
প্রতিটি কূটনৈতিক আলাপচারিতার আড়ালে রয়েছেন শেখ হাসিনা, যিনি ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে দিল্লিতে বসবাস করছেন। ছাত্র অভ্যুত্থানে তাঁর ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটলে তিনি সেখানে চলে যান। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বিএনপি সরকার (এর আগের ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের মতো) তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আশ্রয় নিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এস. জয়শঙ্করের কাছে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেন। ভারতের অবস্থান হলো, চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুরোধটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিষয়টি স্থগিত রাখার একটি কূটনৈতিক ভাষা মাত্র। নয়াদিল্লির হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করার জন্য ফেরত পাঠানোর কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু তাঁকে রেখে দেওয়াও একটি সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। যখনই হাসিনা দিল্লি থেকে বিবৃতি দেন বাংলাদেশের নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে, আওয়ামী লীগের প্রবাসী কর্মীদের সমাবেশ করে, শুভেন্দু অধিকারীকে তাঁর বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি সরকার ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ চাপের সম্মুখীন হয়।
একটি সম্ভাব্য মধ্যপন্থা হলো রাজনৈতিক সংযম। নয়াদিল্লি হয়তো নীরবে ভারতীয় মাটি থেকে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিবৃতি সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে ভারত একদিকে যেমন হাসিনাকে একজন সুরক্ষিত রাজনৈতিক নির্বাসিত হিসেবে তুলে ধরতে পারবে, তেমনই অন্যদিকে ঢাকার সঙ্গে চলমান সংঘাতও কমাতে পারবে, যার বেশির ভাগই ভারতে হাসিনার শারীরিক উপস্থিতির কারণে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর অব্যাহত হস্তক্ষেপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। যদি তাঁর হস্তক্ষেপ সীমিত করা হয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতি বিদেশ থেকে পরিচালিত একজন প্রাক্তন নেতার পরিবর্তে ক্রমবর্ধমানভাবে অভ্যন্তরীণ কুশীলব ও অসন্তোষ দ্বারা পরিচালিত হবে। নতুন বিএনপি সরকারের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানে তাঁর নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এও জানেন যে তাঁর দেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাণিজ্য করিডোর, বিদ্যুৎ আমদানি, নদীর পানি, ট্রানজিট অধিকার– বাংলাদেশের উন্নয়নের অবকাঠামো মূলত ভারতীয় সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
এই অনুপ্রবেশের বিষয়টি সবচেয়ে তীব্র বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি সরাসরি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে যুক্ত পরিহাসের বিষয় হলো যে বিজেপির ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি কাঠামোগতভাবে ভালো অবস্থানে আছে। আওয়ামী লীগ নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে, সেই নয়াদিল্লিকে স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে মনে করা হতো। বিএনপি তার নিজস্ব জাতীয়তাবাদী পরিচয় নিয়ে এসেছে, যা তাকে শক্তিশালী অবস্থান থেকে ভারতবিরোধী মনোভাব সামাল দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, কিন্তু এটি তখনই কার্যকর হবে যদি ভারত নতুন সরকারকে কাজ করার মতো কিছু জোগান দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। পাঁচটি সীমান্ত রাজ্যেই বিজেপির নিয়ন্ত্রণ, ঢাকায় নতুন বিএনপি সরকারের প্রত্যর্পণের দাবি, দিল্লিতে শেখ হাসিনার নির্বাসন, ঢাকায় নতুন রাজনৈতিক দূত, ট্রাম্প-যুগের অবৈধ অভিবাসন নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ যা গণপ্রত্যাহারের জন্য আদর্শগত আবরণ দিচ্ছে– এই সমস্ত কারণ একই সঙ্গে একত্রিত হচ্ছে। শর্মা ও অধিকারী আপাতত একমত। তবুও তাদের কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে নয়াদিল্লি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে আলাদা করতে পারে কিনা তার ওপর। সীমান্তসংক্রান্ত বাগাড়ম্বর হয়তো নির্বাচনে জয় এনে দিতে পারে এবং পুশব্যাক দৃশ্যমান পদক্ষেপের জন্য জনগণের দাবি মেটাতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ কেবল আরেকটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি পূর্বাঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই সম্পর্ক উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত ভারসাম্যের ভিত্তি স্থাপন করে। এমন একটি সীমান্ত নীতি যা দেশে প্রশংসা কুড়ালেও সীমান্তের ওপারে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, তা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করে।

শশাঙ্ক তিওয়ারি: কাউন্সিল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স রিসার্চের একজন গবেষক এবং এর আগে তিনি সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের সঙ্গে কাজ করেছেন। গত ৪ জুন প্রকাশিত ভারতীয় সাময়িকী ফ্রন্টলাইন থেকে ভাষান্তর করেছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন।


 

আরও পড়ুন

×