সুশাসন
নাইজেরিয়া নাকি সিঙ্গাপুর: কোন পথে বাংলাদেশ?
প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে হবে
শাফিউল ইসলাম
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৫:৩২
একটি দেশের উন্নতি নির্ভর করে দক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থার ওপর। দক্ষ জনপ্রশাসনের অভাবে সম্পদশালী দেশ হলেও তার উন্নতি হয় না—পৃথিবীর বহু দেশে তার নজির আছে। নাইজেরিয়া তার বড় উদাহরণ। আফ্রিকার এই দেশটি তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা গড়ে তুলতে পারেনি। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জনগণের বড় অংশ এখনও দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অর্থাৎ সম্পদ থাকলেই উন্নয়ন হয় না; উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন ও কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
আবার রুয়ান্ডার দিকে তাকালে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। যুদ্ধ ও গণহত্যায় বিধ্বস্ত একটি দেশ মাত্র তিন দশকে আফ্রিকার অন্যতম সুশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা রুয়ান্ডার এই অগ্রগতির স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে—দক্ষ জনপ্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। একইভাবে সিঙ্গাপুরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন ছোট্ট রাষ্ট্রটি আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে মূলত দক্ষ প্রশাসন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, কঠোর জবাবদিহি ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লী কুইন ইউ বিশ্বাস করতেন, ‘রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে আগে প্রশাসনকে দক্ষ ও সৎ করতে হবে।’ তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক সংস্কৃতি আজও সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। জনশক্তি আছে, কৃষি আছে, ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুশাসন? সেখানে রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি। জনপ্রশাসন ক্রমেই দলীয় প্রশাসনে পরিণত হয়েছে। দক্ষতার জায়গায় প্রাধান্য পেয়েছে আনুগত্য; জবাবদিহির জায়গায় এসেছে প্রভাব-প্রতিপত্তি। ফলে বলা যায়, দেশের জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গভীর সংকটে রয়েছে।
তার প্রতিফলন আমরা গত ২১ মে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখতে পাই। ওইদিন সমকাল প্রধান শিরোনাম করে, ‘প্রশাসনে বদলি পদায়ন ও নিয়োগ নিয়ে তালগোল’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশাসনের বদলি, পদায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধিদপ্তর ও সংস্থার প্রধান, এসপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বদলি, পদায়ন কিংবা নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিতর্কের মুখে দুই মাসে অন্তত ১৫ জনকে প্রত্যাহার করতে হয়েছে সরকারকে। বাছাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি, তথ্যের ঘাটতি ও তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের কারণেও নিয়োগ বাতিলের নজির দেখা গেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তত সাতজন কর্মকর্তা বদলির আদেশ অমান্য করেছেন।
একই দিনে সহযোগী আরেকটি দৈনিকে প্রকাশিত হয় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ– ‘বদলীয় পরও কার্যালয় ছাড়ছেন না হাইওয়ে পুলিশের এসপি, ১৬ চিঠিতে ৭৭ জনকে রদবদল’। সেখানে বলা হয়, দুই দফা বদলির পরও এক পুলিশ সুপার দাপ্তরিক আদেশ অমান্য করে দায়িত্ব ছাড়েননি; বরং বদলির আদেশের পরও অধীনস্থ কর্মীদের রদবদল করেছেন। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য এর চেয়ে বড় সংকেত আর কী হতে পারে?
এই দুটি সংবাদ কেবল খণ্ডচিত্র। বাস্তব পরিস্থিতি হয়তো আরও ভয়াবহ। প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলার অভাব, কর্তৃত্বের দুর্বলতা, দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির সংকট রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?
চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে কীভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার? এই প্রশাসন দিয়ে কি তা সম্ভব? প্রশ্নটি অমূলক নয়। বাস্তবতা হলো, নির্বাচিত সরকারকে এই বিদ্যমান প্রশাসন নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু সরকার যদি নিজের প্রশাসনিক আদেশই কার্যকর করতে না পারে, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরবে কীভাবে? একজন এসপি যদি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিক তাঁর কাছ থেকে কী ধরনের সেবা আশা করবেন?
আরেকটি ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল—একজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, তিনি ‘সাত দিন ধরে ডিআইজিকে পাচ্ছেন না’। একজন ব্যবসায়ীর বক্তব্যও ভাইরাল হয়। তিনি বলেন, ‘আজকের পরিস্থিতি বুঝতে পারলে লেখাপড়া করে সচিব হতাম, বড় চোর হতাম।’ আরেক ব্যবসায়ী বলেন, তাঁর সন্তানরা আর বাংলাদেশে ব্যবসা করবে না। এসব বক্তব্য নিছক আবেগ নয়; এগুলো রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।
প্রশাসনের এই অবস্থা কেবল কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; এটি দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতার ফল। বিগত সতের বছরে প্রশাসনে যে দলীয় আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশাদারিত্বকে দুর্বল করেছে। ফলে প্রশাসন আজ জনগণের সেবক নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থরক্ষাকারী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। আমলাতন্ত্রের এই দুর্বৃত্তায়ন রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। এই দুই দুর্বৃত্তায়নের সমন্বিত প্রভাব উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলে, রাষ্ট্রের বড় সংকটগুলো কেবল প্রশাসনিক দক্ষতায় নয়, দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই মোকাবিলা করা সম্ভব। সিঙ্গাপুরে লী কুয়ান ইউ, মালয়েশিয়ায় ডা. মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা রুয়ান্ডায় পল কাগামে প্রশাসনিক সংস্কারকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিলেন। তারা বুঝেছিলেন—রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমে প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশে সেই ধরনের দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাটতি স্পষ্ট। বর্তমান সরকারের মধ্যে বিগত সতের বছরের দলীয়করণ ও অদক্ষতার প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও সংস্কার-সাহস এখনো দৃশ্যমান নয়। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার ও জনগণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
বাংলাদেশ এখনও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। জনসংখ্যাগত সুবিধা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যদি প্রশাসন অদক্ষ, অনিয়ন্ত্রিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তাহলে সেই সম্ভাবনা নাইজেরিয়ার মতো অপচয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অন্যদিকে, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে রুয়ান্ডা কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো রূপান্তরের উদাহরণ সৃষ্টি করাও অসম্ভব নয়।
অতএব, এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক সংস্কারকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করার। দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা ও দক্ষতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে হবে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রকে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে জনপ্রশাসনকে আবারও জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের সব বড় বড় পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ড. শাফিউল ইসলাম: জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
