ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

শিশুদের অভয়াশ্রমে যখন শিশুরাই অনিরাপদ

শিশুদের অভয়াশ্রমে যখন শিশুরাই অনিরাপদ
×

গওহার নঈম ওয়ারা

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হলো। ঈদ উৎসবের মধ্যেও প্রধান খবর হয়েছিল এটি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জানিয়ে দেন, ‘এ ঘটনাকে আমরা খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছি।’ সরকারের দুটি আর হাসপাতালের মালিকপক্ষ একটি; মোট তিনটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে কথা দিলেও পরে জানিয়ে দেয়, তারা তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জনগণকে জানাবে না। তবে সরকারকে দেবে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে ধাওয়া দেওয়া হয় সংবাদমাধ্যম কর্মীদের। এসব ঘটনা ঘটেছে ছয়টি শিশুর মৃত্যুর মতো নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তবে হৃদয়বিদারক খবরটি আমি প্রথম শুনলাম লন্ডনের এক ফোন কলে। ঈদের আগের মাঝরাতে মারগারিতা ওভারসিস কলে জানতে চায়, ‘মগবাজারে কী হয়েছে?’ উদ্বিগ্ন মারগারিতা অধীর হয়ে প্রশ্ন করে– কত শিশুর প্রাণ গেছে? মারগারিতার উদ্বেগ মিশে যায় কোরবানির প্রাণীর চিৎকারের সঙ্গে। 

বাংলাদেশের এমন একটি খবর কীভাবে লন্ডনে মারগারিতা পর্যন্ত পৌঁছে গেল, আর কেনইবা তাঁর এ উদ্বেগ– সে প্রসঙ্গে বলতে গেলে আদ্-দ্বীন হাসাপাতাল প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ইতিহাসটুকু তুলে ধরতে হয়। 
হাসপাতালের জায়গাটা আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করতে দিয়েছিল ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এবং ‘টাউনস ওমেনস গিল্ডস’। মারগারিতা পারিবারিক সূত্রে সে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত। তার নানির আগ্রহে সে বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে ভাবে ও তহবিল সংগ্রহ করে। ‘টাউনস ওমেনস গিল্ডস’ এবং ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক  রাজকুমারী অ্যান হওয়ায় শুরু থেকে এ দুই প্রতিষ্ঠান মিলেমিশে কাজ করতে থাকে। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭৪ সালে দেখা দেয় মহা খাদ্য সংকট। মায়েদের বুকে দুধ নেই; শিশুদের খাবার নেই। অপুষ্টির পারদ হু হু করে বাড়তে থাকে। এ সময় ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ শুরু করে ঢাকায় মৃত্যুপথযাত্রী শিশুদের জন্য বিশেষ পুষ্টি কর্মসূচি। লন্ডন থেকে ছুটে আসেন ‘টাউনস ওমেনস গিল্ডস’-এর কর্মীরা। জন হপকিন্সের সেন্টার ফর মেডিকেল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের কারিগরি সহযোগিতায় শুরু হয় ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর নিউট্রিশনাল রিসার্চ ইউনিট-এনআরইউ। পরে এটা চিলড্রেনস নিউট্রিশন ইউনিট-সিএনইউ নামে পরিচিতি পায়। ক্রমেই সেই পুষ্টি সহায়তা কেন্দ্রটি হয়ে ওঠে এ দেশের মৃতপ্রায় শিশুদের অভয়াশ্রম।

শিশুদের জন্য বাড়ি কেনা 
সংকটের সেই দিনগুলোয় অফিসের জন্য বাড়ি ভাড়া পাওয়া গেলেও ঢাকায় গরিব ছিন্নমূল শিশু আর তাদের মায়েদের চিকিৎসার জন্য কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি ছিল না। এ সমস্যা থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে ‘টাউনস ওমেনস গিল্ডস’। তারা জমিসহ একটা বাড়ি কিনে ফেলে শিশুদের অভয়াশ্রম সিএনইউর জন্য। ক্রমেই সিএনইউ হয়ে ওঠে মাতৃ ও শিশুপুষ্টি প্রশিক্ষণের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান। যুক্ত হন প্রয়াত শিশু চিকিৎসক ডা. তোফায়েল আহমদ। ঠিক হয়, দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিশুদের জন্য একটা বিশেষ হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ সরকার সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহযোগিতায় শুরু করে সেই কাজ। ধানমন্ডির একটি ভাড়া করা বাড়িতে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৭ সালে শেরেবাংলা নগরে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু হলে পুরো বন্ধ হয়ে যায় মগবাজারের সিএনইউ। ঠিক হয় মগবাজারের বাড়িটি এমন একটা দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে যারা শিশু ও মায়েদের জন্য একটা শিশু- সংবেদনশীল পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তুলবে। সে শর্ত নিয়েই সিএনইউর সেই বাড়িটি দেওয়া হয়েছিল আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে। 

শিশু-সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অঙ্গীকার করলেও আদ্-দ্বীন আর পাঁচটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো সেবা বিক্রি করতে থাকে। সেভ দ্য চিলড্রেন, সিএনইউর সাবেক কর্মী এবং টাউনস ওমেনস গিল্ডসের সদস্যরা যে আশঙ্কা করেছিলেন, সেটাই ভয়ংকরভাবে অনেক প্রাণের বিনিময়ে সত্য প্রমাণিত হলো ঈদের আগের রাতে। 

ছাড় পাবে না কেউ
ঘটনার দুদিন পর মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ‘ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত অপরাধী ছাড় পাবে না।’ এমন রাজনৈতিক বক্তব্য আর ক্ষুব্ধ মানুষের মনে মলম দেওয়া বাণী সর্বকালীন। বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানোর কায়দায় আবার বলেছেন, ‘আদ্-দ্বীনের ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেলের পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ আমরা আজকাল আগের মতোই গা বাঁচাতে সংবিধান আর ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইনের দোহাই দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। তাই ভয় হয়, অ্যাটর্নি জেনারেলের হাজার হাজার ফাইলের নিচে শিশুদের আর্তনাদ না চাপা পড়ে যায়!

তদন্তের সারসংক্ষেপ সংবাদমাধ্যমকে জানানোর সময় মন্ত্রী বলেছেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিলেন না। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।’ এখন প্রশ্ন উঠেছে– যে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ ঢাকায় তাদের আইকন হাসপাতালটা ঠিকমতো চালাতে পারে না; সেখানে কীভাবে তারা দেশে আরও কয়েকটি হাসপাতাল ব্যবসা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে? সেগুলোর অবস্থাও খতিয়ে দেখা হবে তো? নাকি কিছু নার্স আর জুনিয়র চিকিৎসকদের বলির পাঁঠা বানানোর সাবেক চর্চার পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

শিশু হাসপাতালের মতো একটা জরুরি প্রতিষ্ঠান মুনাফামনস্ক মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্যই কি আমাদের এত রক্তদান, সংগ্রাম, স্বাধীনতা যুদ্ধ? শিশু হাসপাতালসহ সব হাসপাতালে শিশু সুরক্ষা বিধিমালা প্রণয়ন, চালু এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।  

এর বাইরে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে হবে, মগবাজারের হাসপাতালটায় ঢাকার দ্বিতীয় শিশু হাসপাতাল ও শিশু পুষ্টি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা? এটি সম্ভব হলে যেমন বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, তেমনি আদি দাতাদের (‘টাউনস ওমেনস গিল্ডস’) প্রতিও সম্মান জানানো হবে।  

গওহার নঈম ওয়ারা: কলাম লেখক, শিশু অধিকারকর্মী    
[email protected]

আরও পড়ুন

×