হাম ও হামের উপসর্গ
শিশুমৃত্যুর জন্য কে দায়ী?
আরাফাত আশওয়াদ ইসলাম
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৫:৫৬
গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে হামে শিশুমৃত্যুর খবর ঠিকই এসেছে, কিন্তু সেই খবর যেন রাষ্ট্রের দরবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ছয় শিশু মারা গেছে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগে– মোট ৫৮৩ জন। এ সংখ্যা যে কোনো সচেতন নাগরিকের হৃদয় ভারাক্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি সত্যিই এই মৃত্যুকে ‘প্রতিরোধযোগ্য’ মনে করেছে?
দেশে ভ্যাকসিনের ঘাটতি এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থায়ন সংক্রান্ত বিলম্ব– এ দুই কারণে কয়েক মাস ধরে টিকাবঞ্চিত থাকতে হয়েছে অসংখ্য শিশুকে। অথচ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সংবাদ প্রকাশের পরও সেই সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্ত সেই প্রশাসনের কেউ এগিয়ে এসে বলেননি, ‘আমরা কেন ব্যর্থ হলাম’।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান সরকারও কি বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে? এখনও জাতীয় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখনও তদন্তের জন্য কোনো উচ্চক্ষমতার কমিটি গঠন করা হয়নি। এখনও ভ্যাকসিন সংকট মোকাবিলায় কোনো টাস্কফোর্স নেই। সরকার যদি তাদের রাজনৈতিক ইশতেহার বাস্তবায়নে এত ব্যস্ত হয় যে শিশুমৃত্যুর এই চরম সংকট তারা ‘মেরামতের অপেক্ষায় রাখা খুঁটিনাটি’ ভাবতে বসে, তবে সেই সরকারের নৈতিক ভিত্তি কোথায়?
এটি আর দশটা স্বাস্থ্য সংকটের মতো নয়। হামের টিকা এতটাই সুলভ ও সময়োপযোগী যে একটি কার্যকর প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এ দেশের প্রশাসন বসেছিল কাগজপত্রের জটিলতায়। আর সেই জটিলতার মূল্যে দিতে হয়েছে শিশুদের জীবন। একটি শিশুর মৃত্যুও অসহনীয়, এখানে পাঁচশর বেশি শিশু– তাও কেবল মার্চ থেকে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এই মৃত্যু যেন শ্রেণিবৈষম্যের হিসাব ধরে। নীরবতার এ মহড়া চলছে বলেই মনে হয়, কারণ বেশির ভাগ শিশুই ছিল দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। উচ্চবিত্ত কোনো এলাকার শিশু এই হামে মারা গেলে হয়তো বেল বেজে উঠত অনেক আগেই। এই বৈষম্য আরও ক্ষোভের।
আরেকটি হতাশাজনক দিক হলো সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) কেন এই ইস্যুতে এত নীরব? সংসদে তারা কণ্ঠ না তুললে সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজ একা কতদূর যেতে পারে?
প্রতিটি মৃত শিশুর পেছনে আছে এক মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার নিস্পৃহ চাহনি। তাদের কাছে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ বা ‘বর্তমান সরকারের ব্যস্ততা’ বড় বুলি নয়। তারা জানে শুধু টিকা দেওয়া যেত, দেওয়া হয়নি। বাঁচানো যেত, বাঁচানো হয়নি।
আরাফাত আশওয়াদ ইসলাম: কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- শিশুর মৃত্যু
