জনস্বাস্থ্য
অকার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকে মানবিক সংকট
আনোয়ার খসরু পারভেজ
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগ জীবাণুর বিস্তার আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়। এটি এখন আমাদের দরজায় কড়া নাড়া এক দৃশ্যমান মহাবিপর্যয়। বাংলাদেশ আজ এই সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক মোহনায় দাঁড়িয়ে। যে অ্যান্টিবায়োটিক একদা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবজাতিকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার ছিল, আজ আমাদেরই অসচেতনতায় তা অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বহুল প্রচলিত ৩৬টি জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে ক্রমশ তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। প্রায় ৯৬ হাজার রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ আবশ্যিক অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত অন্তত পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণু প্রতিরোধের হার ৭৯ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ আরও জেঁকে বসার আশঙ্কাই বেশি।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত সারাদেশে মোট যত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়েছে, তার ৫৭ শতাংশই ঢাকায়। ঢাকার পরের অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও সিলেট। দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০টি অ্যান্টিবায়োটিক হলো সেফট্রিয়াক্সোন, সেফিক্সিম, মেরোপেনেম, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, অ্যামোক্সিসিলিন, মেট্রোনিডাজল, ক্লক্সাসিলিন, পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাকটাম ও ভ্যানকোমাইসিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এগুলোর অযথা ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীর ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই আর সাড়া দিচ্ছে না। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য, জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় শেষ ভরসা বা ‘লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ‘মেরোপেনেম’-এর বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা ২০২২ সালের ৪৬.৭ শতাংশ থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে। আমাদের শেষ ঢালও আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার পথে।
একদা যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া বা মূত্রনালির সংক্রমণের মতো সাধারণ রোগকে আমরা সহজে নিরাময়যোগ্য ভাবতাম, তারা আজ অবাধ্য দানবের রূপ ধারণ করেছে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ, ক্ষতবিক্ষত মানুষের শরীরগুলো হয়ে উঠেছে এই প্রতিরোধী জীবাণুদের অবাধ চারণভূমি।
সাম্প্রতিক মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের নিজস্ব গবেষণায় দেখা যায়, হাসপাতালে সংক্রমিত স্ট্যাফাইলোকক্কাস নামে জীবাণুটি দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর অর্ধেকেরও বেশি প্রজাতি এখন ‘মেথিসিলিন’ প্রতিরোধী। এর সরল অর্থ হলো, সামান্য আঁচড় বা একটি সাধারণ সংক্রমণই অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে– যেসব জীবাণু একসময় অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, দীর্ঘদিন সেই ওষুধ ব্যবহার না করায় তারা আবার দুর্বল হয়েছে এবং চিকিৎসায় কার্যকর প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।
এই সংকট প্রাকৃতিকভাবে আসেনি। একে আমরা যূথবদ্ধ অবহেলার মাধ্যমে ডেকে এনেছি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক কেনা এবং একটু সুস্থ বোধ করলেই ওষুধের কোর্স অসমাপ্ত রেখে দেওয়া– এই দুই অভ্যাসের কারণে জীবাণু নিজেদের জিনগত রূপান্তর ঘটিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। দেশের পোলট্রি ও মৎস্য খাতে ৭৬.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ ঘটছে। প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি ও মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত এই ওষুধের অবশিষ্টাংশ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে মিশে মাটি ও পানিকে প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির এক বিশাল কারখানায় পরিণত করছে।
নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পথটি অত্যন্ত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং পুঁজিবাদের বাজারে তুলনামূলক কম লাভজনক। ফলে বিশ্বব্যাপী ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই গবেষণায় বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের হাতে থাকা অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে, অথচ নতুন কোনো অস্ত্র তৈরি হচ্ছে না।
এই আসন্ন মহাপ্রলয় থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এখনই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় একটি ‘আক্রমণাত্মক’, সমন্বিত বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ এবং কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ– এই তিনটিকে আলাদা না ভেবে একক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সঠিক কালচার টেস্ট বা পরীক্ষানির্ভর প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বন্ধ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে চালু করতে হবে ‘অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম’।
সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে জরুরি। আমাদের বুঝতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ জ্বরের ওষুধ নয় এবং এটি ভাইরাসজনিত (যেমন সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা) রোগে কোনো কাজ করে না। অ্যান্টিবায়োটিক অসীম বা নবায়নযোগ্য কোনো সম্পদ নয়। এর প্রতিটি ডোজ অত্যন্ত মূল্যবান এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ: অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য