সংস্কৃতি
ফিরে চল মায়ের টানে
কাওসার চৌধুরী
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ১২:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে; কিংবা ‘মা, আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা…।’ মাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অসংখ্য গান বাংলায় যেমন আছে, তেমনি আছে বিভিন্ন ভাষায়। মাতৃরূপের প্রশংসা, মায়ের কাছে আব্দার, আহ্লাদ, অভিযোগ, অনুযোগ ইত্যাদি উঠে এসেছে এসব গানে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিতামাতার অবদান অস্বীকার করার ক্ষমতা কার আছে, বলুন! নিজে পেটপুরে না খেয়েও যে নারী স্কুলগামী সন্তানের টিফিন বক্স ভর্তি করে দিতেন কয়েক পদ খাবার দিয়ে, সেই নারীই আমাদের মা। নিজের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে যে মানুষটি বছরের পর বছর সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চেয়েছেন, সেই মানুষটিই আমাদের পিতা।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে দুটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মায়ের প্রতি পরিবারের ক্ষমার অযোগ্য দায়িত্বহীনতা দেশবাসীকে হতবাক ও ক্ষুব্ধ করেছে। বয়োবৃদ্ধ দুজন নিঃসঙ্গ মায়ের গলিত (প্রায়) মৃতদেহ দুটি বাসা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ এবং স্থানীয় লোকজন। অথচ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে লব্ধপ্রতিষ্ঠ তাদের সন্তানেরা। দাবি উঠেছে, দায়িত্বজ্ঞানহীন (!?) এই সন্তানদের বিচারের মুখোমুখি করার; প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সন্তানদের মানসিক সুস্থতা পরীক্ষার!
আমার মনে হয়, তার আগে আমাদেরই ছোট্ট একটা ‘মেন্টাল চেকআপ’ প্রয়োজন। কারণ আমাদের যাপিত জীবনের নিত্যকার চালচিত্র। প্রতিদিন সকালে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই নজরে পড়ে মারামারি, মব, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্ধতা, শিশুহত্যা, ব্যাংক লুট, ক্ষমতার লড়াই, খুন-জখম, নিজের মাটি ও মানুষের প্রতি অবজ্ঞা-অনীহার সংবাদ। রাষ্ট্র ও সমাজ যাবে অন্ধকারের দিকে; পক্ষান্তরে আমাদের পরিবারগুলোতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্নেহের বন্ধন হবে দৃঢ় ও আন্তরিক– এমন আশা করা কতখানি যৌক্তিক?
যে সমাজে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে, পেটায়, গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় প্রতিষ্ঠান থেকে; যেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে রাস্তায় উল্লাস করে কিছু মানুষ, তাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? শিক্ষক কিংবা মুক্তিযোদ্ধারা ফেরেশতা নন। যদি তাদের কোনো বিচারযোগ্য অপরাধ থাকে, তার জন্য আদালত বিদ্যমান। আইনি ধারায় আদালত তার ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু আইনকে তো আমি-আপনি নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না।
দৃষ্টিটা একটু ফেরাই পণ্যের বিজ্ঞাপনের দিকে। পণ্যের বাজার তৈরির জন্য মাফিয়া চক্রগুলো একটি অভিনব ‘কৌশল’ অবলম্বন করে থাকে। তারা বলে, কোনো জাতির কাছে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে আগে তাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করো। এই লক্ষ্যে বেনিয়ারা আমাদের সংস্কৃতির ওপর হামলে পড়েছে অনেক আগেই।
আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন আর মূল্যবোধের অবক্ষয় তো উল্লিখিত ওই ‘মন্ত্রের’ই ফসল। বেনিয়াদের ‘প্রডাক্ট পেনিট্রেশন’ আর আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় সমান্তরালেই তো চলছে। অথচ সেই ‘ভাঙনের শব্দ’ শুনেও রাষ্ট্র সুবোধ দর্শকের ভূমিকায় নীরবতা পালন করে! সেই নীরবতার উৎপত্তিস্থল তো নিকট অতীতে দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে খুব কাছে থেকেই।
ভুলে গেলে চলবে না– রাষ্ট্রের প্রতি পরিবারের দায়দায়িত্ব যেমন আছে; বিপরীতক্রমে ব্যক্তি আর পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রেরও কিন্তু দায়দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের সংবিধানই তা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করছে যথাযথভাবে?
আমাদের পরিবারগুলোতে মূল্যবোধের বিপর্যয়ের বড় একটি প্রভাবক হলো দেশে প্রচলিত ‘তিন-চার ধারা’র শিক্ষা ব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি শিশু গোড়া থেকেই বৈষম্যপূর্ণ একটি মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে। শিক্ষাক্ষেত্রে এসব ধারার কোনো কোনোটি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি থেকে একেবারেই আলাদা।
জানি, শ্রেণিবিভক্ত কোনো সমাজে কখনোই অবিভাজ্য একটি সংস্কৃতি থাকতে পারে না। তাই বলে এই জনপদের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর যাপিত জীবনের লালিত সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের একটি ‘জাতিগত ঐকমত্য’ কি থাকবে না? আমাদের রাজনীতিতেও প্রায় একই ধরনের সমস্যা বিরাজমান। বিগত ৫৪ বছরেও আমরা একটি ‘জাতিগত ঐকমত্যে’ (ন্যাশনাল কনসেন্সাস) পৌঁছতে পারলাম না। জাতির এই ব্যর্থতা কি সমাজ ও পরিবারকে প্রভাবিত করে না? দুজন অসহায় মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর কারণ ব্যবচ্ছেদের সময় এই বিষয়গুলো কি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি নয়?
২০১৩ সালে শেখ হাসিনার সরকার ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়ন করেছিল। সেই আইনে সন্তানদের দায়বদ্ধ করা হয়েছে বৃদ্ধ পিতা-মাতার মতামত অনুযায়ী তাদের যত্ন নিতে। সেই আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধানও আছে। তাতে কার্যকর কোনো ফল হয়েছে কি? মিরপুরে দুজন হতভাগ্য মায়ের এই অসহায় মৃত্যু কি আইনের ফলপ্রসূতার কথা বলে?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যতদিন একটি গ্রহণযোগ্য সাম্য না আসবে; যতদিন আমাদের রাষ্ট্রে বেনিয়াদের প্রতাপ বন্ধ না হবে; জাতি যতদিন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবে না; ততদিন রাষ্ট্র ও সমাজ যেমন স্থিতিশীল হবে না, তেমনি প্রবীণ নাগরিকদের অসহায়ত্বও যাবে না। চিরন্তন পারিবারিক মূল্যবোধের সুরক্ষাও সম্ভব হবে না। পরিবার সমাজেরই ক্ষুদ্রতম ইউনিট। আর রাষ্ট্র তো গড়ে ওঠে সমাজেরই ভেতর থেকে।
সে জন্যই এই নিবন্ধের শিরোনাম ‘ফিরে চল মায়ের টানে’। পরিবারের মানুষ মায়ের বুকে ফেরার চেষ্টায় আকুল হবে; আর রাষ্ট্র থেকে যাবে তার প্রতিকূলে– সেটা হবে প্রবঞ্চনার নামান্তর। যেটা কারও কাম্য হতে পারে না।
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা
- বিষয় :
- সংস্কৃতি
