আন্তর্জাতিক
বাংলাদেশের ওপর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার প্রভাব
এম হুমায়ুন কবির
এম হুমায়ুন কবির
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ১২:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইতোমধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি-বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের কোনো পারমাণবিক প্রকল্প না থাকুক। ৬০ দিন পরে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আমরা জানি না। কথা অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। চূড়ান্ত চুক্তির আগ পর্যন্ত তারা কোনো ফি বা টোল আরোপ করবে না। পরে কী হবে সেটা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা আছে। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সম্মত নয় বলে মনে হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মার্কিন প্রশাসন এটি মেনে নিতে পারে।
১৯৭৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র গঠনের পর ইরানে যে সরকার গঠিত হয়েছে; মার্কিন সরকার প্রত্যক্ষ, প্রকাশ্যে, গোপনে কিংবা অন্য যে কোনোভাবে এই সরকারের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়েছে। প্রায় ৪৭ বছর মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থায় আছে। এ জন্য স্যাংকশন বা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর যৌথ হামলা করেছে। একের পর এক হামলা হলে ইরানও পাল্টা হামলা চালাল।
ইরান একটা প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি চাচ্ছিল– কেউ কারও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। দীর্ঘদিন ধরে ইরান বিভিন্ন পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছিল, সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। ইরান চাইছে, এসব নিষেধাজ্ঞা যেন তুলে নেওয়া হয়। আগামী ৬০ দিন এসব ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যে টাকা আটকে রেখেছে, যা ১০০ বিলিয়নের মতো হবে, সেটা এই ৬০ দিনের আলাপ-আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়নের মধ্যে ১২ বিলিয়ন, পরে আবার ১২ বিলিয়ন উন্মুক্ত করা হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলবে। নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হবে কিনা– সেটা নিয়ে আলাপ হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন চুক্তি গৃহীত হবে, তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দ্বারা তা অনুসমর্থিত হতে হবে।

এই চুক্তির ফলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমরা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অস্থিরতা দেখেছি। এই পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে পুরো প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়েছে। ইরান-ইসরায়েল ইস্যু, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা– এগুলো নিয়েও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। আমার মনে হয়, যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তাহলে চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক দিকে যেতে পারে। এরপরও নিকট ভবিষ্যতে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। সেগুলো মাথায় রেখেও এ কথা বলা যায়।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের কারণে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি। তাদের এখন নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে। তার কারণ, চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা আছে– চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে এসব অঞ্চল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক স্থাপনাগুলো প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় ছোট ছোট দেশের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেছে এবং সেখানে রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে চলে যায়, তাহলে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে বিশেষত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে এসব দেশকে ইরানের সঙ্গে এক ধরনের প্যাক্ট করতে হবে। ইরান ও এসব উপসাগরীয় দেশ মিলে একটি নতুন বাতাবরণের দিকে এগোবে– এ রকম একটি অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। আমার মনে হয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির মধ্য দিয়ে এই সম্ভাবনা একটু বেড়েছে।
তৃতীয়ত, ইসরায়েল ইস্যু। ইসরায়েল এ চুক্তি নিয়ে অত্যন্ত অখুশি। ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশের আগে যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, সেটাও ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ইসরায়েল এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ভন্ডুল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের বিপুলসংখ্যক সমর্থক রয়েছে, যারা এ কাজটা করতে তৎপর থাকবে।
ইসরায়েল যদি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তারা ভিন্ন চিন্তা করতে পারে। তখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি সরাসরি যুক্ত হবে। এই তৃতীয় চিন্তা বা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিনের প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে নতুন একটি সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, যদিও তা অনেক জটিল প্রক্রিয়া।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাতাবরণ এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশসহ ইরান এর ঘোর সমর্থক। সৌদি আরবও বহু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বিশেষত গাজা ও ইরান যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। কারণ ফিলিস্তিন হলো সমস্যার মূল সূত্র। যদি ইসরায়েল তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদেরও নতুন চিন্তা নিয়ে আসতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা চলছিল, এই নতুন বাতাবরণ ঘিরে সেগুলোর অবসানে একটা বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে হয়। যদিও এখানে যারা অংশীদার রয়েছেন, তারা এই বাস্তবতার কতটা ব্যবহার করবেন, সেটা বলা মুশকিল। আমার ধারণা, এই বাস্তবতায় সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও এটি ইতিবাচক। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমরা প্রচুর পরিমাণ তেল, গ্যাস আমদানি করি, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারসহ অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যও আমদানি করি। এগুলো আমাদের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে সাপ্লাই চেইন যদি ঠিক থাকে, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে তেলের জন্য ইতোমধ্যে ৪২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে লাখ লাখ বাংলাদেশির কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটিও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আমরা মনে করি। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগসহ বহু ক্ষেত্রে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
- বিষয় :
- মতামত
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
