অন্যদৃষ্টি
ডিজিটাল জালে বন্দি তারুণ্য
মো. নাঈম ইসলাম
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি ১০ বছরের শিশু রাত ৩টায় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের নীল আলোয় মুখ ডুবিয়ে বসে আছে। এই দৃশ্য আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বর্তমান সময়ের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এক দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশও সেই স্রোতে ভাসছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যম আজ মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিণত। শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা ও বিনোদনে এসব প্রযুক্তির ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন ধরনের সামাজিক ও নৈতিক সংকট তৈরি করছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি।
সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক মাধ্যম ও ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকছে। তাদের একটি বড় অংশ অশালীন, বিভ্রান্তিকর ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে। জনপ্রিয়তা তথা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেকে মানহীন বা অনৈতিক কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দিচ্ছে অবলীলায়। এর পরিণতি কেবল একাডেমিক অবনতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তাদের মনোযোগ, নৈতিক বিকাশ এবং মানসিক স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে আঘাত করছে।
প্রযুক্তির প্রসার অবশ্যই আমাদের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এখনও শিখিনি, কীভাবে একে ব্যবহার করতে হয়।
এই সংকটের গভীরতা অনুধাবন করে বিশ্বের বেশ কিছু উন্নত দেশ ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউবসহ প্রধান সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। ডেনমার্ক ১৫ বছরের নিচের বয়সীদের জন্য একই ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ফ্রান্স বয়সভিত্তিক অনলাইন নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করেছে। যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের নিচে কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের নীতিগত আলোচনা এগিয়ে চলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করছে। এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে– উন্নত বিশ্ব প্রযুক্তির সঙ্গে আপস করছে না, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি আরও গভীর ও জটিল। অনেক পরিবারে সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নৈতিকতা-বিষয়ক শিক্ষার অনুপস্থিতিতে কিশোররা সহজেই ভুল পথে পা দিচ্ছে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং অশালীন কনটেন্টের বিস্তার সমাজের ভেতর থেকে একটা নীরব অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে যা দেখি তা উদ্বেগজনক। অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের চেয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে বেশি মনোযোগী। তাদের একাডেমিক ফল, মনঃসংযোগ ও শৃঙ্খলা– সবই ক্রমশ ভাঙছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যতের ক্ষতি।
এই পরিস্থিতি কোনো একক হাতে সামলানোর নয়। পরিবার, শিক্ষক, সরকার ও সমাজ– সবাই মিলে একটি সুসমন্বিত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকে হতে হবে প্রথম প্রতিরোধের দুর্গ। অভিভাবকদের সন্তানের ডিজিটাল জীবন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে; নজর রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি ও নৈতিক ব্যবহারের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, তরুণদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা কোনো সমাধান নয়, বরং তাদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতার হাতিয়ার বানাতে হয়। স্মার্টফোন যাতে তাদের মাদকের মতো আসক্ত না করে, বরং জ্ঞানের জানালা হয়ে ওঠে– সেই শিক্ষাই আজকে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। প্রযুক্তি সম্ভাবনার যে দরজা খুলে দিয়েছে, সে দরজা দিয়ে আলো আসবে, না আঁধার ঢুকবে– তা নির্ভর করে আমাদের সচেতনতার ওপর।
মো. নাঈম ইসলাম: কালীগঞ্জ, গাজীপুর
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
