ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

জামায়াতের সমাবেশে সাংবাদিক নিপীড়ন

স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য শঙ্কাজনক

স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য শঙ্কাজনক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মঙ্গলবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে দলীয় এক কর্মসূচি চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা যেইভাবে চার সাংবাদিকের উপর হামলা করিয়াছেন, উহা ন্যক্কারজনক। দলটি যদিও উক্ত ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ এবং দায়ী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা লইবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছে, উক্ত হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি দলটির অবস্থান লইয়া প্রশ্নবোধক চিহ্ন হইয়া থাকিবে। ইতোপূর্বে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহুবার সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠিয়াছে। মঙ্গলবারের হামলার মাধ্যমে জামায়াতও সেই খাতায় নাম লিখাইল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সংবাদকর্মীরা নিছক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হইয়াছেন, যাহার ভিডিওচিত্র ও আলোকচিত্র সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। আমরা মনে করি, ইহা নিছক ব্যক্তি সাংবাদিকের উপর আক্রমণ নহে; বরং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের উপরেও আঘাত। 

দুঃখজনক হইলেও সত্য, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ, মিছিল কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল কর্মসূচির খবর প্রচার করিতে গিয়া সাংবাদিকদের হামলা, মারধর, হুমকি ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ক্রমবর্ধমান। দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া সাংবাদিকরা এমনকি মামলা ও গ্রেপ্তারেরও শিকার হইতেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদের জের ধরিয়া দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানূর ইসলামকে যেইভাবে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে, উহা ছিল স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের ফল। যদিও শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে প্রতিমন্ত্রীর নমনীয়তায় উক্ত সাংবাদিক জামিনে ছাড়া পাইয়াছেন; সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাধীন– বলা যায় না। মূলত এমন বিরূপ পরিস্থিতিই যে সাংবাদিক নির্যাতনে উক্ত জামায়াত কর্মীদের উৎসাহ জোগাইয়াছে, বলাই বাহুল্য।
আমরা দেখিয়াছি, অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা স্বীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভোগ করিয়া থাকে। ফলে ঘটনার পর নিন্দা ও প্রতিবাদের বাহিরে বিচার কিংবা শাস্তি দৃশ্যমান নয় বলিলেই চলে। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভখ্যাত সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাই মানুষকে তথ্য জানাইবার জন্য ঝুঁকি লইয়া মাঠে কাজ করিয়া থাকেন। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলিরও আত্মসমালোচনা জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত স্ব স্ব নেতাকর্মীদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া– সংবাদকর্মীদের প্রতি সম্মান দেখাইতে হইবে এবং কোনো অবস্থাতেই তাহাদের কর্মে বাধা দেওয়া চলিবে না। বিরোধী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীকে এই সত্য অনুধাবন করিতে হইবে।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বও এইখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করিতে সরকারকে সচেষ্ট হইতে হইবে। সংবাদকর্মীরা সরকারি দলের নেতাকর্মী দ্বারা আক্রান্ত হইলেও কেহ নিষ্কৃতি পাইবে না। ইহার সহিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক মামলা বন্ধ করিতে হইবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।

স্মরণে রাখিতে হইবে, সাংবাদিকদের কলম, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কোনো পক্ষ কিংবা বিপক্ষের অস্ত্র নহে। এইগুলি সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থ রক্ষার মাধ্যম। সেই মাধ্যমকে ভয় দেখাইয়া কিংবা হামলা করিয়া স্তব্ধ করিবার চেষ্টা বুমেরাং হইতে বাধ্য। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করিতে হইলে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের বিকল্প নাই। 

আরও পড়ুন

×