ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ইংল্যান্ড

কিয়ার স্টারমারকেও ঢাকল ব্রেক্সিটের দীর্ঘ ছায়া

কিয়ার স্টারমারকেও ঢাকল ব্রেক্সিটের দীর্ঘ ছায়া
×

রাফায়েল বেহর

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটেন শাসন করা অসম্ভব– ব্যাপারটা এমন নয়। তবে দেশটির শীর্ষ পদের পেয়ালায় এমন এক বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দ্রুত কাজ করছে। এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিলেন। ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে পদত্যাগের ভাষণ দেওয়ার জন্য পোডিয়াম দাঁড় করানোর দৃশ্য এখন আমাদের কাছে একটি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে একজন প্রধানমন্ত্রীর গড় মেয়াদ দাঁড়িয়েছে দুই বছরেরও কম। অবশ্য কিয়ার স্টারমারের শাসনের অবসানের জন্য সরাসরি সেই ভোট দায়ী নয়। এই পদের জন্য তাঁর নিজস্ব কিছু দুর্বলতা ছিল, যার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি কেন ক্ষমতা চেয়েছিলেন– সেই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর মানুষ যখন তাঁর কাছে এর ব্যাখ্যা চাইত, তিনি উল্টো বিরক্ত হতেন। তবে আমাদের এই শুষ্ক, ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনৈতিক আবহাওয়ায় যেখানে জনগণের সদিচ্ছার চরম আকাল চলছে, সেখানে স্টারমারের এই দুর্বলতাগুলো আরও নিষ্ঠুরভাবে উদোম হয়ে পড়েছে। 

যখন রাষ্ট্রের সম্পদ একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পেছনে অপচয় হয়, তখন দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের একক বাজার থেকে বেরিয়ে আসা এবং বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার জন্য নতুন নতুন ব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়া দেশের কূটনৈতিক পুঁজি ও অর্থনৈতিক নির্ভরযোগ্যতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ব্রেক্সিট না হলে ব্রিটেনের অর্থনীতি আজ যতটা সমৃদ্ধ হতে পারত, সেই তুলনায় জিডিপি ৪ থেকে ৮ শতাংশে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই হিসাবের মধ্যে মানুষের মানসিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত নেই। যেমন রাজনৈতিক বিতর্কের মান কমে যাওয়া, চরমপন্থা ও মেরূকরণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিষাক্ত হয়ে ওঠা। এই পুরো পরিস্থিতি তৈরি করেছে এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যা দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও দুর্দশাকে ‘মুক্তি’ হিসেবে বিক্রি করেছিল। আর যখন সবকিছু ভেস্তে গেল, তখন তারা ব্রেক্সিট বিরোধিতাকারীদের দোষারোপ করতে শুরু করল– কেন তারা বিজয়ীদের এই অবাস্তব কল্পনাকে মেনে নিচ্ছে না।
অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা, যা পপুলিজম বা জনতোষণবাদের জন্ম দেয়, তার মুখোমুখি হওয়া একমাত্র গণতন্ত্র ব্রিটেন নয়। ইতিহাসবিদরা ব্রেক্সিটকে সমগ্র ইউরোপ ও আটলান্টিকে ছড়িয়ে পড়া সেই জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখবেন, যা উদারপন্থি বিশ্বায়নের আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল। সেই বিশ্বায়ন মনে করেছিল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমেই তাদের আদর্শিক লড়াই চিরতরে জিতে গেছে।

কিয়ার স্টারমার বিরোধী দলে থাকার সময় ব্রেক্সিটের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়কে একটি সামাজিক নিষেধাজ্ঞা বা ‘ট্যাবু’ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, লেবার পার্টির পুরোনো দুর্গের ভোটাররা কালচার ওয়ার বা সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে ব্রেক্সিটপন্থিদের খপ্পরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গে কেবল সেই ভাষাতেই কথা বলা সম্ভব। সরকারে আসার পর এই ভুল ধারণাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ধরনের ধীরগতির ‘ফারাজিজম’ বা ফারাজের নীতি তৈরি করতে জ্বালানি জুগিয়েছে। রিফর্ম ইউকের নেতার যুক্তিগুলোকে সমর্থন ও বৈধতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার মূলত কনজারভেটিভদের সেই ব্যর্থ কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল উগ্র ডানপন্থিদের কাছ থেকে ভোটারদের ফিরিয়ে আনা।

অবশ্য স্টারমার উগ্র ডানপন্থি বয়ানের বিরুদ্ধে একেবারেই কিছু করেননি– তা বলা অন্যায় হবে। তবে প্রায়ই যেমনটা ঘটে, তিনি প্রথমে ভুল পথ বেছে নেওয়ার পরই সঠিক পথটি খুঁজে পেয়েছিলেন। যখন তিনি নিজ দলেই তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছিলেন এবং ব্রিটেনকে ‘অপরিচিতদের দ্বীপ’ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করে উগ্র অভিবাসনবিরোধী নেতা ইনোক পাওয়েলের মতো শোনাতেন, কেবল তখনই তিনি তাঁর সুর পরিবর্তন করেন। গত বছরের লেবার পার্টির কনফারেন্সে তাঁর বক্তব্যটি ছিল আত্মসংশোধনমূলক। তিনি এমন এক দেশপ্রেমের কথা বলেছিলেন, যা ‘ভালোবাসা এবং গর্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা নিজের চেয়েও বড় স্বার্থের সেবা করে।’ তিনি একে ফারাজের নিরবচ্ছিন্ন নেতিবাচক মডেলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা পারস্পরিক বোঝাপড়াকে ধ্বংস করে কেবল ঘৃণার জন্ম দেয়।
কিন্তু স্টারমারের সেই কণ্ঠস্বর কনফারেন্স হলের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেই আবেগকে কীভাবে ধরে রাখতে হয়, তা তিনি জানতেন না। এই দিক থেকে অ্যান্ডি বার্নহাম– যদি তিনি উত্তরসূরি হন, অনেক বেশি প্রাকৃতিক এবং আকর্ষণীয় গল্প বলার ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করবেন। অবশ্য ব্রেক্সিটের এই জাতীয়তাবাদী বিষ দূর করতে কেবল চমৎকার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। যোগাযোগের ব্যর্থতা মূলত শুরু হয় ত্রুটিপূর্ণ নীতি থেকে। বিশ্বস্ততা আসে উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা থেকে। আপনি যখন নিজেই জানেন না– আপনার লক্ষ্য কী, তখন আন্তরিক আবেগের সঙ্গে তা মানুষের কাছে বিক্রি করা কঠিন। 

রাফায়েল বেহর: দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; ইংরেজি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর
ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×