ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

বিতর্ক না বাড়িয়ে দেশটাকে শান্ত রাখুন!

বিতর্ক না বাড়িয়ে দেশটাকে শান্ত রাখুন!
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৫ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ১১:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনেকে বর্ষাকালে সমুদ্র দেখতে যেতে চায়। কারণ বর্ষায় সমুদ্র উত্তাল ও মোহনীয় হয়ে ওঠে। সেই মানুষদের বেশির ভাগই বর্ষাকালে সমুদ্রে নামতে চাইবে না। কারণ উত্তাল সমুদ্র দূর থেকে সুন্দর; ভেতরে বিপজ্জনক। পারে বসে সমুদ্র উপভোগ করা আর সমুদ্রে নামা এক জিনিস নয়। সমুদ্রে নামার জন্য শান্ত সমুদ্রই ভালো। 

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা অনেকটা বর্ষার সমুদ্রের মতো। রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক অস্থিরতা, সামাজিক বিভাজন, বিচার ও আইন নিয়ে টানাপোড়েন– সব মিলিয়ে দেশ যেন ক্রমাগত উত্তাল। কেউ কেউ এই উত্তেজনা উপভোগ করলেও বেশির ভাগ মানুষের জীবনে স্বস্তি ও শান্তি নেই। মানুষ নিরাপদভাবে বাঁচতে চায়; কাজ করতে চায় ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চায়। রাষ্ট্রের কাজও হওয়া উচিত সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।

গত ৫৫ বছরে দেশে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং আইন অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। এসব সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ। কোন কাজটি আগে, কোনটি পরে এবং কোনটি দীর্ঘ মেয়াদে– সেটা ঠিক করতে না পারলে ভালো উদ্যোগও নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ১৮ মাস পর গত ফেব্রুয়ারিতে আমরা নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। এ সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা। আগের ১৮ মাসে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রায়ই বলত, তারা ধ্বংসস্তূপ পেয়েছে। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের প্রকৃতি কী এবং কোন প্রতিষ্ঠান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র কখনও উপস্থাপন করেনি। নির্বাচিত সরকারও সে কাজটি করছে না।

বরং আমরা দেখেছি বঞ্চনা দূরীকরণ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম একসঙ্গে শুরু হলেও সেগুলোর পেছনে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, নীতি, সময়সূচি ও অগ্রাধিকার দৃশ্যমান নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর-বাইরে ‘জগাখিচুড়ি’ তৈরি হচ্ছে। 

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই প্রাতিষ্ঠানিকতার চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে আইন ও বিধির চেয়ে ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতার অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বেড়েছে, জবাবদিহি কমেছে এবং নাগরিকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।
আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের স্পষ্ট সীমারেখা সত্ত্বেও প্রায়ই দেখি পরস্পরের প্রতি দায় চাপানোর প্রবণতা। রাজনৈতিক, সামাজিক, জনমতের চাপে কখনও কখনও প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদারিত্ব থেকে সরে আসে। এতে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় একটি বিরল সুযোগ দিয়েছিল– রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানো, আস্থা ফিরিয়ে আনা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার। দুর্ভাগ্যজনক, আমরা সেই সময় অপচয় করেছি পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্কে। ফল হয়েছে উল্টো। সামাজিক বন্ধন আরও দুর্বল হয়েছে এবং বিভাজন আরও বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এটাকে স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেব? নাকি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে থামব?

রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের নেতৃত্বের উচিত একটি মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছা। আগামী কয়েক বছর দেশকে উত্তাল নয়; শান্ত রাখতে হবে। সংস্কার করতে হবে। কিন্তু এমনভাবে করতে হবে যাতে জনসাধারণের জীবন অস্থির না হয়ে ওঠে।

উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য খাতে সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে; হামে মৃত্যু নিয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আবার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো প্রাতিষ্ঠানিকতা ও অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এক বিষয়। কিন্তু তার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করা আরেক বিষয়। যে ধরনের অঘটনের কারণে এ ব্যবস্থা, সে ধরনের ঝুঁকি দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও আছে কিনা? থাকলে তা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? বিচ্ছিন্নভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সমস্যার মূল কারণ দূর করার উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি।

সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারের আয়-ব্যয় বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি হয়তো আইনগতভাবে সঠিক। ওয়াক্‌ফ আইন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা জবাবদিহির প্রশ্নে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিও থাকতে পারে। প্রশ্ন হলো, এটি কি এখনকার সবচেয়ে জরুরি কাজ?

দেশে এখনও অন্তত ২৭ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনশৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগ সংকট রয়েছে। প্রশাসনের সামনে অসংখ্য অগ্রাধিকারমূলক কাজ রয়েছে। এই বাস্তবতায় একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান নিয়ে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি কতটা প্রয়োজনীয় ছিল? 

রাষ্ট্র ও সরকারের কাজ উত্তেজনা তৈরি করা নয়; উত্তেজনা কমানো। বিতর্ক বাড়ানো নয় বরং বিতর্ক কমানো। মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত না করে বরং মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া।

বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া আদর্শিক বিজয় নয়; রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়। এমনকি সামাজিক সংঘাত নয়। তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া শান্তি। কারণ শান্তি থাকলে মানুষ কাজ করতে পারে, বিনিয়োগ করতে পারে, শিক্ষা নিতে পারে, পরিবার গড়তে পারে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারে।
তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় জড়িতদের প্রতি বিনীত অনুরোধ– দয়া করে দেশটাকে শান্ত রাখুন। যেসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন, সেগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করুন। মানুষের জীবনকে উত্তাল না করে স্থিতিশীল করুন। কারণ উত্তাল সমুদ্র দেখতে ভালো লাগতে পারে; কিন্তু জাতি গড়ে ওঠে শান্ত সমুদ্রের তীরেই।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×