ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত

বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত
×

‘চায়ের দাওয়াত মানে কী?’ দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘আমাকে পদত্যাগ করতে বলবে’

আদিত্য আরাফাত

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ১৬:৪১

একসময় দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ছিল। ২০০৪ সালে ব্যুরো থেকে হয় দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। এর মাধ্যমে সংস্থাটিকে সরকারের প্রভাবমুক্ত করা হয়। আইন দুদককে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন– যে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান, তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়েছে। আইনের যে সীমারেখা তাতে কোনো রাজনৈতিক নির্দেশ, প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করার কথা নয় দুদকের। দল নিরপেক্ষ ভূমিকাই হবে প্রতিষ্ঠানটির। আইনের বইয়ে এসব থাকলেও বাস্তবে ‘কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়াল ঘরে নেই’ প্রবাদের মতোই। 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দুদকের ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। দেশের সাধারণ মানুষেরও প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থাহীনতার সংকট রয়েছে। এর কারণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক সরকার, আবার কখনও অরাজনৈতিক বা অনির্বাচিত সরকারের সময় সরকারের সময় প্রতিষ্ঠানটি প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারেনি। তাই দুদকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি প্রায়ই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।

সম্প্রতি এ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা মুনীর চৌধুরী।  যিনি প্রেষণে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুদকের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক এ আমলা সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন,  সারাদেশে তিনি দুর্নীতিবিরোধী অ্যানফোর্সমেন্ট অভিযানের সূচনা করেছিলেন। সে সময় কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ইকবাল মাহমুদ। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কাস্টমস, কর বিভাগ, বন্দর, নৌপরিবহন, রাজউক, তিতাস, কারাগার, সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, অডিট অধিদপ্তরসহ নানা প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হতো তখন। দুদককে আরও কার্যকর ও আধুনিক সংস্থায় রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ও ভারতের সিবিআইয়ের আদলে সাজানোর উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন।

ওয়াকিটকি, হেলিকপ্টার সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিশেষ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু মুনীর চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কিছু মহল দুদকের কার্যক্রমের ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত। তিনি দাবি করেন, সেই চাপ মেনে নিতে তিনি রাজি হননি। তাঁর স্ট্যাটাসের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের একটি মন্তব্য। নাম উল্লেখ না করেই তিনি লিখেছেন, চেয়ারম্যান একদিন তাঁকে বলেছিলেন, ‘থামো, এভাবে চললে আমাকে বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত দেবে।’ মুনীর চৌধুরী বিস্মিত হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘চায়ের দাওয়াত মানে কী?’ জবাবে চেয়ারম্যান  বলেছিলেন, ‘আমাকে পদত্যাগ করতে বলবে।’

ঘটনাটি নিছক একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। দুদক প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে চারটি কমিশনই তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান ২০০৪ সালের ২২ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি পুরো কমিশনসহ পদত্যাগ করেন। সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘বঙ্গভবনের চায়ের দাওয়াত’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরীও নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আসার পর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া গোলাম রহমান, বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ মেয়াদ পূর্ণ করলেও পরবর্তী সময়ে মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহর কমিশনও একই পরিণতির মুখোমুখি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁকেও পদত্যাগ করতে হয়। সবশেষে সাবেক সচিব ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরো কমিশন রাষ্ট্রপতি বরাবর চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করেন। 

দুদকের ইতিহাসে ‘বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত’ কথাটি ব্যাপক আলোচিত। অফ দ্য রেকর্ডে দুদকের  একাধিক চেয়ারম্যান পদত্যাগের পর বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াতের বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে খোলাসা করেছেন। এটি মূলত আমলাতন্ত্রে রূপক ভাষা। সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্তারা এ ভাষাতেই বুঝেন তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। ‘বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত’ মানে যে বঙ্গভবনে যেতে হবে বিষয়টি তা নয়। যারা পদত্যাগ করেছেন তারা রাষ্ট্রপতির বরাবর ‘রিজাইন লেটার’ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেই জমা দেন। তারপর তা যায় রাষ্ট্রপতির কাছে। 

যাইহোক দুদকের সপ্তম কমিশন মেয়াদ পূরণ করার আগে পদত্যাগের কারণে সাড়ে তিন মাস ধরে নেতৃত্ব শূন্য। কমিশন না থাকায় এ সময়ে মামলা-অভিযোগপত্র অনুমোদনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। এমন অবস্থায় সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অর্থাৎ খুব শিগগিরই দুদক নতুন নেতৃত্ব পেতে পারে এটা আশা করা যায়। এখন প্রশ্ন–নতুন নেতৃত্ব কেমন হবে?

বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আইন নয়, বরং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। দুদকের হাতে ক্ষমতা কম নেই। মুখের কথায় দুদককে নখদন্তহীন বলা হলেও আইনে যে ক্ষমতা আছে তা কম নয়। সমস্যা হচ্ছে সেই ক্ষমতা ব্যবহারের স্বাধীনতা। অতীতেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক সরকারগুলো মুখে দুর্নীতিবিরোধী শক্ত অবস্থানের কথা বলত কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত দুদকে একের পর এক ‘ধরা’ ও ‘ছাড়া’র  বার্তা পাঠাত। অর্থাৎ কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির ফাইল খুলত আর কাউকে দিত ক্লিন সার্টিফিকেট বা দায়মুক্তির সনদ! আবার অনেক ক্ষেত্রে দুদকের নেতৃত্বও অতি উৎসাহী হয়ে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষ’র হুকুম আসার আগেই নিজেরাই অতি উৎসাহী হয়ে কাজ করে থাকে। এসব প্রায় চেনা দৃশ্য। 

দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থাকার নিশ্চয়তা না থাকলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। তখন জনগণের চোখে দুদক হয়ে উঠবে একটি মোসাহেবি প্রতিষ্ঠান।  

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও পরিবর্তনের আওয়াজ তুলেছে। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলছে। নির্বাচনী অঙ্গীকারেও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথম শর্ত হলো একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকর দুদক। নতুন কমিশন গঠনের এ মুহূর্তে তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ– দুদক কি এবার সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে, নাকি ভবিষ্যতের কোনো নতুন চেয়ারম্যানকেও ‘বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত’-এর আশঙ্কা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে?

আদিত্য আরাফাত: সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×