মানবাধিকার
গুলির দাম ১৫০ টাকা, আর জীবনের দাম?
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ১৪:১২
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। কিছু ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় কয়েকদিন আলোচিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কিছু ঘটনা থেকে যায় রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে এক অনিবার্য প্রশ্ন হয়ে। সাহাদাত হোসেন শ্যামলের ঘটনা তেমনই একটি ঘটনা।
২০১৯ সালের ১৪ মার্চে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর সাত বছর পেরিয়ে গেছে। এই সাত বছরে শ্যামল শুধু একটি গুলিবিদ্ধ শরীর নয়, বরং আমাদের বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থার দীর্ঘ ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি হাইকোর্ট তাঁর চিকিৎসার জন্য দুই লাখ টাকা ১ মাসের মধ্যে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং কেন তাঁকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে রুল জারি করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এই ঘটনার সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার অন্যতম কারণ ছিল একটি গুলি ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ১৫০ টাকার ক্ষতি করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় গুলির মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু যে তরুণের পায়ে সেই গুলি ঢুকে তার স্বাভাবিক জীবন, কর্মক্ষমতা, শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করে দিল, তার ক্ষতির মূল্য নির্ধারণ কিংবা পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্রের তৎপরতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। এখানেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও মানবিক দায়বদ্ধতার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একজন নাগরিকের জীবনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেআইনি প্রয়োগ কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, শ্যামলের ঘটনা তার একটি নির্মম উদাহরণ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসা, শারীরিক যন্ত্রণা, কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা -সবকিছুই তাঁকে বহন করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীকালে তাঁকে মিথ্যা মামলার হয়রানিও সহ্য করতে হয়েছে এবং এখনো সেই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।। অর্থাৎ একজন ভুক্তভোগী নাগরিককে শুধু গুলির ক্ষত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নানা স্তরে অবহেলা ও প্রতিকূলতার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়; এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি মৌলিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অস্তিত্বশীল; নাগরিকের জন্য ভয়, অনিশ্চয়তা বা নিপীড়নের উৎস হয়ে ওঠার জন্য নয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও একই নীতি অনুসরণ করে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর), যার রাষ্ট্রপক্ষ বাংলাদেশ, রাষ্ট্রকে জীবনের অধিকার রক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের জন্য প্রণীত বলপ্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক নীতিমালাও বলপ্রয়োগকে কঠোরভাবে প্রয়োজনীয়তা, বৈধতা, অনুপাতিকতা ও জবাবদিহির শর্তের অধীন করেছে।
আমাদের দেশের বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বেআইনি বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ঘটনায় বহুবার দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তদন্ত হয়েছে, কমিটি গঠিত হয়েছে, সুপারিশ জমা পড়েছে; কিন্তু দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর শাস্তির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কমই দেখা গেছে। এর ফলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে - দায়মুক্তির সংস্কৃতি। যেখানে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা অনেক সময় নাগরিকের অধিকার রক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বলে জনমনে ধারনা রয়ে গেছে।
দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ায় না; এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থাকেও দুর্বল করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বরং যাদের হাতে বলপ্রয়োগের বৈধ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে, তাদের জন্য জবাবদিহির মানদণ্ড আরও কঠোর হওয়া উচিত। কারণ ক্ষমতার অপব্যবহারের পরও যদি কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে আইনের শাসনের ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে শ্যামলের ঘটনা কেবল ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন নয়; এটি প্রতিকারের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রতিকার বলতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে সত্য উদঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই বিবেচনায় শ্যামলের জন্য দুই লাখ টাকা চিকিৎসা সহায়তার নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়।
শ্যামলের ন্যায়বিচারের সংগ্রামে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সাত বছর আগে একজন তরুণ পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হলেন, তাঁর জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত হয়ে গেল, অথচ কার্যকর প্রতিকার পেতে তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হলো - এ বাস্তবতা কোনো অধিকারভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমরা আশা করবো, শ্যামলের পাশে থাকা স্বনামধন্য মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র(আসক) এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন, বিশেষ করে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো আইন তখনই কার্যকর বলে বিবেচিত হয়, যখন তা ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে প্রয়োগ করা যায়।
শ্যামলের ন্যায়বিচারের লড়াই আসলে একজন তরুণের ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই। এটি সেই ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের পরও কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে। এটি সেই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার লড়াই যে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তার মূল্য আছে এবং সেই মূল্য কোনোভাবেই একটি গুলির দামের চেয়ে কম নয়।
আজ শ্যামলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা। রাষ্ট্র যদি এই মুহূর্তে সঠিক বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু শ্যামল নন- ক্ষতিগ্রস্ত হবে আইনের শাসনের প্রতি নাগরিকের আস্থা, ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- মানবাধিকার
