অক্সিজেন লিকেজে শিশুমৃত্যুর অভিযোগ
চিকিৎসালয়গুলি শিক্ষা লইতেছে না কেন?
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর একটি হাসপাতালে অক্সিজেন লাইন লিকেজের কারণে শিশুর প্রাণহানি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। চার মাসের শিশুটির প্রাণহানি কেবল পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নহে, ইহা দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্তির বাস্তব নির্মমতাও তুলিয়া ধরিতেছে।
শ্যামলীর এমন একটি বাণিজ্যিক ভবনে উহা অবস্থিত, যথায় অন্তত পাঁচটি হাসপাতাল আপন অস্তিত্ব ঘোষণা করিতেছে। আমাদের দেশে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের কয়েকটা ফ্লোর ভাড়া লইয়া যেইভাবে ভেকছত্রের ন্যায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাতে প্রশ্ন– স্বাস্থ্য খাতে আদৌ কোনো তদারকি প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে কিনা। পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো, স্বয়ংসম্পূর্ণ সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট, জরুরি বহির্গমন পথ এবং কঠোর অগ্নি-নিরাপত্তা প্রটোকল ইত্যাদি আবশ্যক। বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনে এই সকল সুবিধা নিশ্চিতকরণ প্রায় অসম্ভব। একই ভবনে হোটেল ও হাসপাতাল থাকিবার ফলে অগ্নিঝুঁকি ও জীবনঝুঁকি দ্বিগুণ করিয়া তোলে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রাজউকের ন্যায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির চক্ষু ফাঁকি দিয়া কিংবা তাহাদের উদাসীনতায় বৎসরের পর বৎসর এহেন কার্যক্রম চলমান।
চার মাসের শিশুটির বাবা অভিযোগ করিয়াছেন, চিকিৎসায় তাহার সন্তান ভালো হইতেছিল। গ্যাস লিকেজের কারণে বাচ্চার প্রাণহানি ঘটিলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উহা স্বীকার করিতেছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক দাবি করিলেও ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় অক্সিজেন লাইনে বিকট শব্দে লিকেজ হইবার অঘটনটি যেই কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনেই গভীর সন্দেহের উদ্রেক করে।
একটি সভ্য সমাজে চিকিৎসার নামে এমন কাঠামোগত অবহেলা চলিতে পারে না। অক্সিজেন লাইনের ত্রুটি কিংবা ভবনের মিশ্র ব্যবহার, যাহাই হউক না কেন, ইহা স্রেফ দুর্ঘটনা নয়; প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি।
আমরা জানি, দেশজুড়িয়া হাম ও ইহার উপসর্গে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০০ শিশু প্রাণ হারাইয়াছে। হামে আক্রান্ত শিশুর যথাযথ চিকিৎসা সরকার নিশ্চিত করিতে পারে নাই। বিশেষত, যেই সকল শিশুর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে, তাহাদের চিকিৎসার জন্য আইসিইউর প্রয়োজন পড়ে। ইতোপূর্বে সমকালের প্রতিবেদনেও আসিয়াছে, অনেক সংকটাপন্ন শিশুকেও সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা দেওয়া যায় নাই। উপরন্তু বেসরকারি হাসপাতালে যাইয়া সর্বস্বান্ত হইয়াছেন অনেক অভিভাবক। ইহার পরও যথাযথ সেবা যে অনেকেই পায় নাই; আলোচ্য শিশুর প্রাণহানি উহার প্রমাণ।
আমরা চাই, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হউক। অক্সিজেন লাইনের বিস্ফোরণ বা লিকেজের পশ্চাতে হাসপাতালের যাহাদের গাফিলতি ছিল, তাহাদের চিহ্নিত করিয়া শাস্তির আওতায় আনা হউক। কোনো ক্ষতিপূরণই শিশুটির বিনিময় হইতে পারে না। তাহার পরও শিশুটির পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। তৎসহিত দেশের সকল বাণিজ্যিক ভবনে গড়িয়া উঠা হাসপাতালগুলির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। অবকাঠামোগত দিক হইতে যেই সকল হাসপাতালের নিরাপত্তা সংকট রহিয়াছে, সেইগুলির বিষয়ে ব্যবস্থা লওয়া জরুরি। হাসপাতালের নামে এই সকল বাণিজ্যিক ফাঁদ বন্ধ না হইলে অবহেলার বলি হইয়া আরও অনেক শিশু মৃত্যুঝুঁকিতে থাকিবে।
ইতোপূর্বে সরকার ছয় নবজাতকের প্রাণহানির ঘটনায় রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করিয়াছে। এই সিদ্ধান্ত লইয়া বিতর্ক থাকিলেও আমরা বিশ্বাস করি, অন্তত অন্যান্য হাসপাতাল ইহা হইতে শিক্ষা লইবে। পাশাপাশি সরকারকে শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। হাম, ডেঙ্গু কিংবা এই ধরনের যেই কোনো চিকিৎসা সংকট মোকাবিলায় সরকারের যথাযথ প্রস্তুতি থাকিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
