ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

সিপিডির সংলাপে বক্তারা

বাজেটে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি

বাজেটে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেটে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ  আয়োজিত সংলাপে এ দাবি জানান আলোচকরা। 

‘কর ন্যায্যতা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনার পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে গবেষণা সংস্থা সিপিডি। এতে সহযোগিতা দিয়েছে ক্রিসচিয়ান এইড। সংলাপে আলোচকরা জাতীয় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা কেবল পরিমাণগত সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন কর কাঠামোয় রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তামিম আহমেদ। তিনি কর ন্যায্যতার চারটি মূল স্তম্ভ– উন্নয়নে সমতাপূর্ণ অর্থায়ন, রিগ্রেসিভ ট্যাক্স হ্রাস, রাজস্ব ছিদ্র বন্ধ এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরেন।

দেশের কর আদায় জিডিপির তুলনায় ৭ শতাংশের নিচে হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআইর সভাপতি কামরান টি রহমান। তিনি বলেন, কর বাড়াতে কেবল বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে কর জাল বাড়ানো জরুরি। তিনি খুচরা বিক্রি পর্যায়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম কর এবং আপিলের ক্ষেত্রে ডিসিটির আদেশের বিপরীতে ১ শতাংশ জমা দেওয়ার নতুন বিধানের বিরোধিতা করেন। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পাওয়ায় টাকার মান কমে যাওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলী তৈরি পোশাক খাতের সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, অধিকাংশ কারখানা বর্তমানে লোকসানে চলছে। তিনি আন্তঃকোম্পানি ঋণের ওপর কর আরোপ এবং খুচরা পর্যায়ে অগ্রিম কর আদায়ের জটিলতা নিরসনের দাবি জানান। এনবিআরকে আরও ব্যবসাবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানান।
হাতেম আলী যুক্তি দেন, নগদ সহায়তা কোনো আয় নয় বরং এটি একটি ভর্তুকি। তাই এর ওপর কর আরোপ করা অনুচিত। শিল্পের করুণ দশা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক কারখানা লোকসানে চলছে এবং উচ্চ ব্যাংক সুদ ও করের চাপে উদ্যোক্তারা টিকে থাকার লড়াই করছে।

ভারতসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেভাবে উদ্যোক্তাদের সরাসরি জমি ও আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে, বাংলাদেশে তার বিপরীতে সুবিধা কমিয়ে কর বাড়ানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং ‘এমপ্যাথি’ বা করদাতার জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের সুবিধা-অসুবিধা বুঝে নীতি নির্ধারণ করতে এনবিআরের প্রতি আহ্বান জানান সরকারের রাজস্ব সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। বাজেট আলোচনা কেবল ৩০ জুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। 
কর ন্যায্যতার জন্য রাজস্ব, পুনর্বণ্টন, পুনর্মূল্যায়ন ও প্রতিনিধিত্ব– এই চারটি নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে আবদুল মজিদ আয়কর আইনের এমন কিছু ধারার সমালোচনা করেন যেখানে ৫০ বছর আগের ফাইল আবার খোলার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায্যতা বলেও মনে করেন তিনি।

এনবিআরের সদস্য (ট্যাক্স পলিসি) মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, সরকার একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এবার অনেক ব্যবসা ও উৎপাদনমুখী পণ্যের উৎসে কর কমানো হয়েছে এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে করদাতাদের ভোগান্তি কমানোর প্রক্রিয়া চলছে।
মুতাসিম বিল্লাহ দাবি করেন, সরকার কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করার চেষ্টা করছে, যেখানে যার সামর্থ্য বেশি তিনি বেশি কর দেবেন। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৫০টির বেশি উৎপাদনমুখী পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে আধা শতাংশ করা হয়েছে। 

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রেজওয়ান রহমান অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এটি সৎ করদাতাদের প্রতি চরম অন্যায়। এ ছাড়া এসএমই খাতের উন্নয়নে একটি জাতীয় ডেটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া কর হারের পূর্ব অনুমানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে উচ্চ করহার (সারচার্জসহ প্রায় ৪৪ শতাংশ) মূলধন পাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তিনি স্বচ্ছতা আনতে প্রপার্টি ডেটাব্যাংক তৈরির সুপারিশ করেন।

ব্যবসায়ী সংগঠন বিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী সেবা খাত বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে কর কমানোর দাবি জানান। বাজেটে থোক বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নীতি শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
স্টার্টআপ কোম্পানি চালডাল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিয়া আশরাফ ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী ৯ বছরের জন্য স্টার্টআপদের কর অব্যাহতির সুযোগ প্রদান এবং ‘গ্রোথ স্টেজ’ স্টার্টআপের সংজ্ঞাকে আরও পরিষ্কার করার দাবি জানান।
ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দুলাল নিম্ন আয়ের করদাতাদের ওপর স্ল্যাব পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চাপের কথা বলেন এবং সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সুবিধাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।

আরও পড়ুন

×