ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

সমকাল ও রেড অরেঞ্জ আয়োজিত গোলটেবিল

বাল্যবিবাহকে জাতীয় সংকট ঘোষণা করার দাবি

বাল্যবিবাহে এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ, হার ৫১ শতাংশের বেশি

বাল্যবিবাহকে জাতীয় সংকট ঘোষণা করার দাবি
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৯ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১০:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক ও আর্থিক নানা সূচকে দেশ এগিয়ে গেলেও কিছুতেই থামছে না বাল্যবিবাহের থাবা। দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ২৪ ভাগ নারী ১৮ বছর হওয়ার আগেই সন্তানের মা হচ্ছেন। বর্তমানের শম্বুকগতিতে চললে দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ হতে অন্তত ২১৫ বছর লাগবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ চিত্র তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলেন, বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়। এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত জাতীয় সংকট। সংকট মোকাবিলায় তরুণদের অংশগ্রহণ, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, সমন্বিত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এর প্রতিরোধে কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। 

দৈনিক সমকাল ও বেসরকারি সংস্থা রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে সহযোগী ছিল ইউথ শেয়ার-নেট প্রকল্প ও অ্যামপ্লিফাইচেঞ্জ। 
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব (পরিকল্পনা) ডা. মো. সারোয়ার বারী বলেন, দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। দেশের ২৪ শতাংশ নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। বাল্যবিবাহ এবং কম বয়সে সন্তান জন্মদানে খুলনায় সংকট তুলনামূলক বেশি। সেখানে বাল্যবিবাহের হার ৬১ শতাংশেরও বেশি এবং ১৮ বছরের আগেই মা হচ্ছেন ৩১ শতাংশ নারী।

তিনি বলেন, দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, লিঙ্গবৈষম্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্যের অভাব, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাল্যবিবাহকে ত্বরান্বিত করছে। এ সংকট উত্তরণে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের (সিএমআরএ) বিশেষ বিধানের অপব্যবহার বন্ধ, স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি, কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ছেলে ও পুরুষদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

ইউথ শেয়ার-নেট প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরে রেড অরেঞ্জের পরিচালক (স্বাস্থ্য ও জেন্ডার) খালেদা ইয়াসমিন বলেন, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৮ সাল পর্যন্ত দেশের পাঁচটি বিভাগে তরুণদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে সচেতন করা হবে। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে এসআরএইচআর নিয়ে সর্বস্তরে সচেতনতা তৈরিতে জ্ঞানমেলা আয়োজন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণকে জরুরি সামাজিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে এর সমাধানে ২০১৭ সালের সিএমআরএ সংশোধন করে ‘বিশেষ বিধান’ ধারাটি অপসারণ/সংশোধন করা, বাধ্যতামূলক ডিজিটাল বয়স যাচাই, কৈশোর-বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, যৌন শিক্ষা (সিএসই) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে আমরা জোর দিচ্ছি। 

অনুষ্ঠানে আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সাইদ রুবায়েত বলেন, অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন কৌশল প্রয়োজন। শিক্ষা, নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, জেন্ডার সমতা ও তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে বহু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। 

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের এসআরএইচআর বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাইদ হাসান বলেন, বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ মূলত জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংকট। অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এতে কিশোরীদের শিক্ষা, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত বলেন, নারীর সক্ষমতা সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে। নারীর নেতৃত্ব, কেয়ার ইকোনমিতে অবদানের স্বীকৃতি এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক উপস্থাপনা করতে হবে।

দলিতের হেড অব প্রোগ্রাম তপন কুমার বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাল্যবিবাহের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, জলবায়ুজনিত সংকট এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞানের অভাব এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইপসার পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু চট্টগ্রামের পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, দুর্গম এলাকায় তথ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা কিশোরীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। 

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস নাসরীন বলেন, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার, পারিবারিক দিকনির্দেশনার অভাব এবং জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করছে। এটি প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধি হেমা চাকমা পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা নিয়ে বলেন, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি পাহাড়ের সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অনেক এলাকায় এখনও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেনি। বহু বাল্যবিবাহ প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থেকে যায়। শুধু শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি নয়, সামাজিক মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন জরুরি।  

ন্যাশনাল ইয়ুথ কোয়ালিশন অন পপুলেশন, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এসআরএইচআর-এর কাউন্সিল সদস্য শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, এখন অনেক কিশোর-কিশোরী পরিবারের অমতে বিয়ে করছে, যা পরবর্তী সময়ে নানা সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে। 

আভাস-এর প্রজেক্ট অফিসার ময়ূরী আক্তার টুম্পা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞানের বড় ঘাটতি রয়েছে। তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

ওয়াইএডি-এর সভাপতি মোনতাহের আরাফাত বলেন, বিদ্যমান কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী অবগত নয়। 
প্রান্তজ যুব সংঘের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক মাহমুদ বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা কার্যকরভাবে পাঠদানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে অনেক তথ্য থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। তরুণদের সামনে শিক্ষা, কর্মজীবন ও নেতৃত্বের ইতিবাচক রোল মডেল তুলে ধরার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর যোগাযোগ কৌশল নিতে হবে। 

রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক (প্রোগ্রাম অপারেশনস) আলোক কুমার মজুমদার বলেন, বাল্যবিবাহ, কিশোরী গর্ভধারণ এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকারসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল আইন বা কর্মসূচি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এর জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সবার মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সামাজিক কুসংস্কার ও প্রচলিত রীতিনীতির পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) মতিউর রহমান বলেন, পরিবারে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ার সংস্কৃতি এখনও বড় বাধা। জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। তরুণদের জন্য সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তৈরি এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণদের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

রেড অরেঞ্জের জেন্ডার অ্যান্ড এসআরএইচআর বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হালিদা হানুম আখতার বলেন, নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যমান আইন ও কৌশলের কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। 
বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকালের সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন।

আরও পড়ুন

×