সাদা কালো
প্রতিহিংসার পুরোনো রাজনীতিই চাঙ্গা হচ্ছে?
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ১২:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মঙ্গলবার ধানমন্ডির বাসা থেকে তেজগাঁও কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হয়েই একটু ধাক্কা খেলাম। অঞ্চলভিত্তিক সাপ্তাহিক ছুটির কারণে মঙ্গলবার ধানমন্ডি ও আশপাশ এলাকার শপিংমল ও মার্কেট সাধারণত বন্ধ থাকে। তাই ওইসব এলাকায় যানবাহনের চাপ কিছুটা কমে যায়। কিন্তু ফার্মগেটের ব্যস্ত সড়কেও যানবাহন তেমন ছিল না। ফলে একবার রিকশা বদল করে ধানমন্ডি থেকে মাত্র ১৫ মিনিটেই কর্মস্থলে পৌঁছে গেলাম! অন্য দিন একই পথ পাড়ি দিতে লাগে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট।
২৩ জুন মঙ্গলবার, ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কোনো নির্ধারিত কর্মসূচি না থাকলেও সরকার ঘোষণা দিয়েছিল– তা পালন করতে দেওয়া হবে না। তাই পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলও তৎপর হয়ে ওঠে। রোববার থেকেই নানা সড়ক, অলি-গলিতে চেকপোস্ট বসিয়ে যেভাবে পথচারীর মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও তল্লাশি শুরু করে, তাতেই বোঝা গিয়েছিল মঙ্গলবার ঢাকা শহর কী রূপ ধারণ করবে।
সমকাল অনলাইনের খবর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ১৮ সহস্রাধিক সদস্য ওইদিন মাঠে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিজিবি ও অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। ছয় জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনাসদস্যও নামানো হয়। রীতিমতো সাজ সাজ রব। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে ডিএমপির পক্ষে ‘নাশকতা’র বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে এলাকাবাসীকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানানো হয়। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী ১১ দলও ওই দিন রাজপথে অবস্থান নেয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে তো জামায়াত কর্মীরা চার সাংবাদিককে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়েছেও!
হাবভাব দেখে আমার বিগত আওয়ামী লীগ আমলের কথা মনে পড়ছিল। বিএনপি ও তার মিত্রদের বড় কোনো কর্মসূচি ঘিরে তখনও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অনুরূপ হুঙ্কার ছাড়তেন। মোড়ে মোড়ে কথিত নাশকতাকারী খুঁজতে গিয়ে গোটা রাজধানীতে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করতেন। সেই সঙ্গে চলত গণগ্রেপ্তার অভিযান।
এবার গণগ্রেপ্তার দেখা না গেলেও অনেক এলাকায় এমনকি ঘরে বসে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার বা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। বুধবার সমকাল অনলাইন বলেছে, ওই বিশেষ অভিযানে সোম ও মঙ্গলবার ঢাকায় ৪২ জন এবং সারাদেশে শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আমার ধারণা, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নিরীহ কর্মী-সমর্থক।
এটা এখন সবাই জানে, আওয়ামী লীগের পদধারী প্রায় সব নেতা হয় আগে থেকেই জেলে, নয় দেশ-বিদেশে আত্মগোপনে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা আত্মগোপনে গেলেও গত সংসদ নির্বাচনে ভোটশিকারি বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের আশ্বাস পেয়ে অনেকেই বাড়িঘরে ফিরে এসেছেন। এখন তাদেরই লক্ষ্যবস্তু করছে সরকার। শুধু তাই নয়। তাদের অনেকে ওই বিশেষ অভিযানে প্রাণও হারিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত রোববার ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ইশতিয়াক নামে এক তরুণ আওয়ামী লীগকর্মীর মৃত্যু ঘটে। সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা গাঁজা রাখার অপরাধের কথা বললেও স্বজনদের বক্তব্য– ইশতিয়াককে তাঁর বাসা থেকে পেটাতে পেটাতে তুলে নিয়েছে পুলিশ। ওই দিনই বাড়িতে পুলিশের অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে বরিশালে আওয়ামী লীগের এক ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতার মৃত্যু হয়। আর সোমবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমসা ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা নুরুল আলম কারা-হেফাজতে মঙ্গলবার সকালে মারা গেছেন। স্বজনদের ভাষ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো মামলা ছিল না। আর বাস্তবেও মামলা হলে তারা নিজ বাড়িতে অবস্থান করতেন না।
নিছক দলীয় কর্মসূচি পালন করতে পারেন– এমন সন্দেহে কাউকে কোনো পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করাই যেখানে আইনের বড়সড় লঙ্ঘন, সেখানে গ্রেপ্তারের পর বা গ্রেপ্তার করতে গিয়ে তিন তিনটি মানুষের প্রাণহানিকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বললে কি ভুল বলা হবে?

স্বীকার্য, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ; যদিও অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার এর পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ তুলে ধরতে পারেনি। কিন্তু দল তো নিষিদ্ধ নয়। তাই দলীয় কার্যক্রমে অংশ না নিলে এমনকি পদধারী কোনো আওয়ামী লীগ নেতাকেও গ্রেপ্তার আইনসংগত হতে পারে না। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে সে সময় যুক্তি দিলেও আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিয়েছে। যা বিস্ময়ের ব্যাপার, ওই আইনে কী করা যাবে না– বলা হলেও সেসব নির্দেশনা লঙ্ঘনের শাস্তি সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। অর্থাৎ এই যে মিছিল করা বা জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে এত এত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে; তাদের বিচার হবে কীভাবে– কেউ জানে না। সম্ভবত এ কারণেই এ ধরনের গ্রেপ্তারের শিকার অনেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হচ্ছে, যা আইনের শাসন তো বটেই, মানবাধিকারের সঙ্গেও গুরুতর অসংগতি তৈরি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পাইকারি অপপ্রয়োগ এবং তাতে আটক রাজনৈতিক কর্মীরা পুলিশ ও কারা-হেফাজতে এমন সময় পাণ হারাচ্ছেন, যখন দেশ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতা থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা-ই বলুন; চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে খুনখারাবি-ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধও অন্তর্বর্তী আমলের চেয়ে কমেনি। অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা তো খোদ অর্থমন্ত্রীই স্বীকার করেছেন। কর্মসংস্থানের ঘাটতির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জনপরিসরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা জেগেছে। এ অবস্থায় সবাই যখন অন্তত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করছে তখন আওয়ামী লীগ ঠেকানোর নামে বরং রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই জিইয়ে রাখা হচ্ছে।
যখন দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়ংকর মবতন্ত্র চলছিল তখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল এবং তার প্রধান বারবার মব সন্ত্রাসের সঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতিও অবসানের কথা বলেছিলেন। এটা যে দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে হাঁপ ছেড়ে বাঁচার মতো বিষয় ছিল, তা ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনেই বোঝা গিয়েছিল। এই তো গত ১৬ জুন, প্রধানমন্ত্রী বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে। আমার সঙ্গে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা ফেরত পাব না’ (সমকাল)। তিনি এবং তাঁর দলের নেতারা তো এমনও বলেছেন, কোনো অপরাধ করেনি এমন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার অজুহাত দেখিয়ে বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটানো হচ্ছে।
বিচারের নামে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যা চলছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গয়রহ হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দিয়ে যে কোনো মূল্যে সেগুলোতে শাস্তি দেওয়ার চলমান আয়োজন আদালতকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। গণতন্ত্র বা আইনের শাসনে বিশ্বাসী যে কেউ তাতে বিচলিত বোধ করতে বাধ্য। তাই সংশ্লিষ্ট সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক– আপাতত এটাই কামনা।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
- প্রতিহিংসা
- রাজনীতি
- আওয়ামী লীগ
- সমকাল
